
ইমরান চৌধুরী॥ দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে কৃষিকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক খাতে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এজন্য চলতি অর্থবছর থেকে শুরু করে আগামী ৩ অর্থবছর কৃষি খাতে ধাপে ধাপে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত ও সহনশীল জাতের বীজ উদ্ভাবন, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি গবেষণা এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা বিভাগের এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি)-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। এর বাইরে থোক হিসেবে রয়েছে ২ হাজার ৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য আরো ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে থোক ও বিশেষ বরাদ্দ বাদে কৃষি খাতে ৯ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা বরাদ্দে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে এ বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াবে ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। আর ২০২৯-৩০ অর্থবছরে কৃষি খাতে বরাদ্দের প্রাক্কলন করা হয়েছে ১১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগামী ৩ অর্থবছরে ধাপে ধাপে কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন হলেও শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্খিত ফল পাওয়া যাবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নের মান, কৃষকের কাছে প্রযুক্তি ও সহায়তা পৌঁছানো এবং বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মন্ডল বলেন, কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো অবশ্যই ইতিবাচক। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সেই সঙ্গে কৃষিপণ্যের সময়মতো বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কৃষকের লাভ বৃদ্ধি পায় এমন সব প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। তাই নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রভাব যাতে ইতিবাচক হয়, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
অধ্যাপক সাত্তার মন্ডল আরো বলেন, কৃষকদের অন্যতম বড় সংকট হলো নগদ অর্থের প্রবাহের সংকট। জমি লিজ নেয়া থেকে শুরু করে উপকরণ বাবদ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষকের নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিদের সমস্যা হয় বেশি। এ অবস্থায় কৃষকের অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন কার্যক্রমে তাদের লাভজনক পর্যায়ে টিকিয়ে রাখার বিষয়টি সরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া আবশ্যক।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। উৎপাদন ও কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে কৃষিতে শ্রমিক সংকট মোকাবিলা, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় ও সময় কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
এছাড়া, পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনা, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, নিরাপদ ফসল উৎপাদন, সেচের পানির অপচয় কমানো এবং ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেচে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে নয়; বাণিজ্যিক ও রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে গড়ে তুলতেও বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষকের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। উন্নত জাত ও প্রতিকূলতা সহিষ্ণু উচ্চ ফলনশীল বীজ উদ্ভাবন ও বিতরণ, কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ এবং সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।