\ আমানুর রহমান \
পৃথিবীর বুকে সন্তানের পথচলা শুরু হয় বাবার অস্তিত্বের মধ্য দিয়ে। সন্তানের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে বাবা আজীবন নিঃশব্দে কঠোর সংগ্রাম করে যান। মা যেমন নিজের শারীরিক আরাম বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, বাবা তেমনি জীবনের সব প্রতিকূলতা জয় করে সন্তানের মাথার ওপর গড়ে তোলেন নিরাপদ আকাশ, নিশ্চিত করেন খাদ্যের সংস্থান। ইসলাম বাবার এই অনবদ্য অবদানকে কখনোই উপেক্ষা করেনি; বরং মা-বাবার মর্যাদাকে ঈমান ও ইবাদতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করেছে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ‘বাবার সন্তুষ্টিতেই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং বাবার অসন্তুষ্টিতেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি।’ অর্থাৎ, একজন সন্তানের পার্থিব ও পারলৌকিক সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে বাবার দোয়া ও সন্তুষ্টির ওপর। বাবার ঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়; তবে এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিই সন্তানের জন্য হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার মূল প্রেরণা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর একনিষ্ঠ ইবাদতের নির্দেশের পরপরই মা-বাবার সঙ্গে উত্তম আচরণ করাকে অপরিহার্য (ফরজ) করেছেন। এটি প্রমাণ করে, ¯্রষ্টার ইবাদতের পাশাপাশি মা-বাবার সেবা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সুরা বনি ইসরাইলের ২৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ বিশেষ করে বার্ধক্যে তাঁদের প্রতি সন্তানের আচরণ হওয়া উচিত সর্বোচ্চ সহনশীল ও শ্রদ্ধাপূর্ণ।
কোরআনের নির্দেশ হলো, বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবাকে সামান্য ‘উফ’ শব্দটি পর্যন্ত বলা যাবে না, ধমক দেয়া তো দূরের কথা; বরং তাঁদের সঙ্গে সব সময় বিন¤্র ভাষায় কথা বলতে হবে। এই আয়াতের গভীরে রয়েছে এক অসাধারণ মনস্তাত্তি¡ক ও বাস্তব যুক্তি। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ যেমন শারীরিকভাবে অসহায় হয়ে পড়ে, তেমনি মানসিকভাবেও সন্তানের কাছ থেকে সম্মান ও সান্নিধ্য প্রত্যাশা করে। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা যায়, যেসব সমাজে বয়স্ক মা-বাবার প্রতি যতœশীলতা বেশি, সেখানে পারিবারিক বন্ধন ও মানসিক স্বাস্থ্য ততো উন্নত।
ইসলামি শরিয়তে বাবার সম্মান ও আনুগত্যের স্থান কোথায়, তা বোঝাতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন কিছু দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, যা চিরকাল অনুসরণীয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) একবার মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ কোনটি?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘সময়মতো নামাজ আদায় করা।’ এরপর কোনটি- জানতে চাওয়া হলে তিনি বললেন, ‘মা-বাবার সঙ্গে উত্তম আচরণ করা।’ এরপর তৃতীয় স্থানে রাখা হয়েছে আল্লাহর পথে জিহাদ করাকে।
অর্থাৎ, মা-বাবার সেবাকে নামাজের ঠিক পরেই এবং জিহাদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদায় স্থান দেয়া হয়েছে। এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়, যখন একজন সাহাবি আল্লাহর পথে জিহাদে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে নবী করিম (সা.)-এর কাছে অনুমতি চাইলেন। নবীজি (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার মা-বাবা কি জীবিত?’ সাহাবি ‘হ্যাঁ’ বললে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন, ‘তাহলে বাড়ি ফিরে যাও এবং তাঁদের সেবার মাধ্যমেই জিহাদ করো।’ এই ঘটনা প্রমাণ করে যে জীবিত মা-বাবার সেবা করা যেকোনো ঐচ্ছিক ধর্মীয় কাজের চেয়েও আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। এমনকি বাবার অনুমতি ছাড়া দীর্ঘ সফরে বের হওয়াকেও ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে; কারণ তাঁর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাকে সম্মান করাও সন্তানের অবশ্যপালনীয় কর্তব্যের অংশ।
বাবার প্রতি অবহেলা বা অবাধ্যতা শুধু পারলৌকিক শাস্তিরই কারণ নয়, পার্থিব জীবনেও তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। হাদিস শরিফে এর মর্মস্পর্শী বর্ণনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, আল্লাহ চাইলে বান্দার অন্যান্য গুনাহ মাফ করে দিতে পারেন, কিন্তু মা-বাবার অবাধ্যতার গুনাহ তিনি ক্ষমা করেন না; বরং এই অবাধ্য সন্তানকে মৃত্যুর আগেই পার্থিব জীবনে এর শাস্তি ভোগ করতে হয়। এমনকি তিনি তীব্র আক্ষেপের সুরে বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি হতভাগ্য, যে তার মা-বাবাকে বার্ধক্যে পেয়েও তাঁদের সেবার মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো না।’ বাবার মর্যাদা রক্ষার আরেকটি অনন্য দিক হলো, তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, সবচেয়ে বড় নেক কাজগুলোর একটি হলো বাবার বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। পরিশেষে বলা যায়, বাবা শুধু একটি সম্পর্কের নাম নয়; তিনি জান্নাতে যাওয়ার এক অনন্য সিঁড়ি। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বাবার সম্মান ও সেবায় নিবেদিত থাকাই হলো একজন সত্যিকারের মুমিনের পরিচয় এবং একটি সুস্থ-সুন্দর সমাজ গড়ার মূল ভিত্তি। -সংগৃহীত
সম্পাদক ও প্রকাশক:
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া
সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ
অফিস: সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। ফোন: ০২৩৩৪৪০৭৩৮১, মোবাইল: ০১৭১৫-৬৮১১৪৮, সম্পাদক, সরাসরি: ০১৭১২-২১৬২০২, Email: laksambarta@live.com, s.bhouian@live.com