আবুল কাশেম\ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পরিবেশ-প্রকৃতি বিরূপ হয়ে উঠার কথা বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই বলে আসছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং এর ভয়াবহ প্রভাবে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, তাপদাহ, ফসলহানি, খাদ্যসংকটসহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে এর আলামত দেখা যাচ্ছে। এর সবচেয়ে বেশি শিকার হবে এবং হচ্ছে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো। বিজ্ঞানীরা বেশ কয়েক মাস আগেই আভাস দিয়েছিলেন, এ বছর একটি সুপার এলনিনো এশিয়াজুড়ে দেখা দেবে। এতে দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহ, খরা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেখা দেবে, যা কৃষি উৎপাদন মারাত্মক বিঘিœত হয়ে খাদ্যসংকট দেখা দেবে। এ মাসের শুরুতে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে এই জলবায়ুগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে, যেখানে সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৪.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেশি ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি চলমান থাকলে কৃষি উৎপাদন ও আঞ্চলিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সঙ্কটের সম্মুখীন হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া ব্যুরা জানিয়েছে, এ বছরের এল নিনো ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস অনুমান করেছে, এটি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এটি এশিয়াজুড়ে কৃষি উৎপাদন হ্রাস, পানিসংকট এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ুজনিত চরম আবহাওয়া আগামী ফসল উৎপাদনের মৌসুমজুড়ে অব্যাহত থাকতে পারে, যার প্রভাব ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের লাখো মানুষের ওপর পড়বে। এতে খাদ্য সরবরাহ, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের আবহাওয়ার বিরূপ লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বন্যা, অতিবৃষ্টি, খরা, অস্বাভাবিক নদীভাঙন, পানিসংকট ইত্যাদি প্রবল হয়ে উঠছে। এর মধ্যে সুপার এল নিনো এই পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে। এর বিরূপ প্রভাব এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশেও পড়ছে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হচ্ছে, এতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত এবং খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। এই সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের কতটা প্রস্তুত বা কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার কোনো তথ্য জানা নেই। তবে এই তথ্য সকলেরই জানা, দেশের কৃষকরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কঠোর পরিশ্রম করে খাদ্য উৎপাদন করে। চাহিদার অতিরিক্তও উৎপাদন করে। তবে তাদের এই অতিরিক্ত উৎপাদন কাল হয়ে দাঁড়ায়। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন ফসলের মৌসুমে কৃষক ফসল উৎপাদন করে যথাযথ দাম পায় না। উৎপাদন করতে যে খরচ হয়, তা উঠাতে পারে না। এতে অনেক কৃষক ক্ষুদ্ধ হয়ে ফসল সড়কে ফেলে প্রতিবাদ করে। আমরা এমনও দেখেছি, উত্তরাঞ্চলের অনেক কৃষক ধান উৎপাদন করে লাভবান হতে না পেরে অন্যপেশায় চলে গেছে। অনেকে ধান চাষ বাদ দিয়ে অন্য ফসল চাষ করছে। এতে ধান উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। এই কয়েক বছর আগে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশ সংকটে পড়ে যায়। তখন কৃষকরা পেঁয়াজ উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেয়। দেখা গেল, পেঁয়াজ উৎপাদনে তারা রেকর্ড করেছে এবং ভারত থেকে আমদানির প্রয়োজন পড়েনি। সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কৃষক ফসল উৎপাদনে চাহিদার সবটুকু পূরণ করলেও তারা মূল্য পাচ্ছে না। তাদের উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণেরও যথাযথ ব্যবস্থা করা হয় না। ফলে অনেক সময় উৎপাদিত ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তারা হতাশ হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত যে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ধেয়ে আসছে, তাতে ফসলের এই অপচয় এবং কৃষকের হতাশা দেশকে ভয়াবহ খাদ্যসংকটের দিকে ঠেলে দেবে। খাদ্যসংকট সমাধানে যদি আমদানি করতে হয়, তবে আমাদের অর্থনীতির পক্ষে তা কুলিয়ে উঠা সম্ভব হবে না। আমাদের অর্থনীতির সেই সক্ষমতা নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট বা সুপার এল নিনোর প্রভাব এশিয়ার দেশগুলোর উপর সবচেয়ে বেশি পড়ছে। খাদ্য সংকট মোকাবেলায় অনেক দেশই তখন খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দেবে। আমাদের যদি আমদানি করতে হয়, তাহলে প্রতিবেশি ভারত থেকেও খাদ্য আমদানি করা যাবে কিনা সন্দেহ। কারণ, সে-ও তার খাদ্যনিরাপত্তার জন্য রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে। এসব বিবেচনায় আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি সকল দেশের জন্যই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতাঞ্চল কিংবা গ্রীস্মমন্ডলীয় দেশÑসব দেশই এর বিরূপ প্রভাবের শিকার হচ্ছে। এই বাস্তবতায় মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি খুবই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবহওয়ার পরিবর্তনজনিত কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং খাদ্যসংকট দেখা দেবে, তা বিজ্ঞানীরা বলে আসছেন। এ প্রেক্ষিতে, উন্নতবিশ্ব তাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে করতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে কৃষকরা যাতে যথাযথভাবে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারে, তা নিশ্চিত করেছে। কৃষক সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রকৃতিগতভাবে আমাদের দেশের কৃষকরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ফসল উৎপাদন করে যাচ্ছে। ফসলের দাম না পেলেও হতোদ্যম হয়ে ভারতের অনেক কৃষকের মতো আত্মহননের পথ বেছে নেয় না। অথচ তাদের সুরক্ষায় সরকারের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। কৃষকদের সুরক্ষায় খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে যে কৃষকরা পরিশ্রম করে যাচ্ছে, তাদের সুরক্ষা সরকার দিতে পারছে না। তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। বছরের পর বছর ধরে কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ খাদ্যসুরক্ষা নিশ্চিতে তাদের সুরক্ষা দেয়ার বিকল্প নেই। তারা যাতে ফসল উৎপাদন করে হতাশ হয়ে না পড়ে, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে। আবহাওয়ার প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কৃষক যাতে ফসল ফলিয়ে খাদ্যোৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, এ ব্যাপারে তাদের সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক:
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া
সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ
অফিস: সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। ফোন: ০২৩৩৪৪০৭৩৮১, মোবাইল: ০১৭১৫-৬৮১১৪৮, সম্পাদক, সরাসরি: ০১৭১২-২১৬২০২, Email: laksambarta@live.com, s.bhouian@live.com