
মো. আকতারুজ্জামান\ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান করিডর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক, বাস, কাভার্ড ভ্যান, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে থাকে। কিন্তু ব্যস্ততম এই মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ এখন ক্রমেই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রায়শই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ, আহত হয়ে অনেকে স্থায়ী পঙ্গত্ব বরণ করছেন।
কুমিল্লা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ৬ মাসে দাউদকান্দি থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১০৫ কিলোমিটার মহাসড়কে ১৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯১ জন এবং আহত হয়েছেন ১৫৪ জন। এসব ঘটনায় প্রায় ১৪০টি মামলা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৪৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে চৌদ্দগ্রামে। এরপর দাউদকান্দিতে ২২টি, বুড়িচংয়ে ১৮টি, সদর দক্ষিণে ১৫টি এবং চান্দিনায় ১৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত মার্চ মাসে বুড়িচংয়ের কালাকচুয়া এলাকায় বাস চাপায় একই পরিবারের ৪ সদস্যসহ ৫ জন নিহত হন। কয়েক দিন পর দাউদকান্দিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ট্রাক খাদে পড়ে প্রাণ হারান ৭ জন। বড় ধরনের এসব দুর্ঘটনা সাময়িক আলোচনার জন্ম দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ মহাসড়কের ডিভাইডার কেটে তৈরি করা অবৈধ ইউটার্ন। বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ, পেট্রলপাম্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে সুবিধামতো ডিভাইডার কেটে এসব ইউটার্ন তৈরি করা হয়েছে। এসব স্থান দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহন হঠাৎ মহাসড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করলে দ্রæতগতির যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে। দাউদকান্দি থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক এমন অবৈধ ইউটার্ন রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার সময় প্রতি ৫০০ মিটার পরপর নির্ধারিত মিডিয়ান গ্যাপ (ইউটার্ন) রাখা হয়। কিন্তু নির্ধারিত স্থান ব্যবহার না করে বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে ডিভাইডার কেটে নতুন ইউটার্ন তৈরি করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ। দাউদকান্দি টোল প্লাজার তথ্য অনুযায়ী, মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে দৈনিক ৮ থেকে ৯ হাজার যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে প্রতিদিন ১৮ থেকে ২০ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি চাপ বহন করছে এই মহাসড়ক।
এছাড়া নির্ঘুম চালক, অতিরিক্ত গতিতে যান চালানো, ছোট ও বড় যানবাহনের গতির পার্থক্য, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল এবং তদারকির ঘাটতিকেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্টার লাইন পরিবহনের চালক মো. বাবুল মিয়া বলেন, ‘দাউদকান্দি থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত অসংখ্য অবৈধ ইউটার্ন রয়েছে। হঠাৎ করেই অটোরিকশা বা মোটরসাইকেল সামনে চলে আসে। তখন দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।’
তিশা পরিবহনের চালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘চার লেনের সুবিধা পুরোপুরি মিলছে না। মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলার চলাচল ও ডিভাইডার কেটে তৈরি ইউটার্নের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগ কুমিল্লা অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘প্রতি ৫০০ মিটার পরপর বৈধ মিডিয়ান গ্যাপ রয়েছে। তারপরও দুর্বৃত্তরা ডিভাইডার কেটে অবৈধ ইউটার্ন তৈরি করছে। খবর পেলেই আমরা তা বন্ধ করি এবং সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ দিই।’ তিনি আরো বলেন, ‘মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধ এবং চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গেলে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।’
মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কুমিল্লা হাইওয়ে রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, ‘মহাসড়কের বিভাজক কেটে অবৈধ ইউটার্ন তৈরি একটা বিপজ্জনক ঘটনা। আমরা প্রতিনিয়ত তিন চাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশা আটক করে আইনের আওতায় নিয়ে আসছি। অবৈধ ইউটার্নগুলো বন্ধ করা গেলে এবং থ্রি-হুইলারের জন্য আলাদা সার্ভিস লেন তৈরি করা হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক:
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া
সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ
অফিস: সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। ফোন: ০২৩৩৪৪০৭৩৮১, মোবাইল: ০১৭১৫-৬৮১১৪৮, সম্পাদক, সরাসরি: ০১৭১২-২১৬২০২, Email: laksambarta@live.com, s.bhouian@live.com