হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় শত শত মানুষের মৃত্যুর পর নেপালে উদ্ধার হওয়া মরদেহের দাফন শুরু হয়েছে। পানির প্রবল স্রোত ও ধ্বংসাবশেষে একের পর এক গ্রাম ও জনপদ তলিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এখনো হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যরা উদ্ধারকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে ছুটছেন। অন্যদিকে, মরদেহের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে উপচে পড়া মর্গে গিয়ে স্বজনের মরদেহ শনাক্ত করার হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
গত বুধবার বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ মিশ্রিত ভয়াবহ স্রোত নেমে এসে নেপালের বিভিন্ন গ্রাম ও শহর প্লাবিত করে। নেপাল এবং সীমান্তবর্তী চীনের তিব্বত মিলিয়ে এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রবল স্রোতে কিছু মরদেহ ভারতের ভূখণ্ডেও ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখনো অন্তত ৩ হাজার ৪৮ জনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের মধ্যে তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে যাওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। নেপালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৯৩৩ জন শ্রমিকও রয়েছেন।
রোববার নেপালি সেনাবাহিনীর সদস্য ও প্রকৌশলীরা হিমালয়ের নদী উপত্যকায় অবস্থিত ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আটকে পড়েছেন বলে ধারণা করা শ্রমিকদের উদ্ধারে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে খননকাজ চালান।
এর আগে উদ্ধারকারীরা টানেলের ভেতরে একটি পাইপ প্রবেশ করাতে সক্ষম হন। এর মাধ্যমে আটকে থাকা শ্রমিকদের অবস্থান শনাক্ত ও উদ্ধারের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা থেকে বেঁচে যাওয়া কয়েকজন শ্রমিক তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের ৩৩ বছর বয়সী সুরেন্দ্র দৌলুরি আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছিলেন। তিনি জানান, হঠাৎ প্রচণ্ড পানির স্রোতে প্রকল্প এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়।
উদ্ধারের চার দিন পর নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে এএফপিকে তিনি বলেন, প্রথমে তারা প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পান। এরপর দেখতে পান টারবাইন ফ্লোর কাদা ও পানিতে ডুবে গেছে। সেখানে ছয়জন শ্রমিক আটকা পড়েছিলেন।
সুরেন্দ্র বলেন, তাদের মধ্যে পাঁচজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও একজন শ্রমিক মারা যান।
দুর্যোগের সময় কয়েকজন শ্রমিক উঁচু স্থানে কিংবা নির্মাণকাজের এমন অংশে আশ্রয় নিতে সক্ষম হন, যেখানে ভয়াবহ পানির স্রোত পৌঁছাতে পারেনি।
নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, রোববার রাতভর বৃষ্টি এবং নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়। খনন করা স্থানে পানি ঢুকে পড়ায় কিছু সময়ের জন্য কাজ বন্ধ রাখতে হয়। পরে পরিস্থিতির উন্নতি হলে আবার উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, হিমবাহ ধসে এ ভয়াবহ দুর্যোগের সূত্রপাত হয়। এর ফলে পানি, বরফ ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ নদীপথে নেমে আসে।
প্রবল স্রোতের কারণে বিভিন্ন স্থানে বড় বড় হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। এসব হ্রদ থেকে নতুন করে কোনো বিপদ তৈরি হতে পারে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করছেন জরুরি বিভাগের কর্মীরা।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বত সীমান্তের একটি বন্দর এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধসের পর নতুন একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় সেখানে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত চীনা উদ্ধারকারীদের রোববার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
চীনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে এ পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
অন্যদিকে, নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, রোববার পর্যন্ত দেশটিতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৫০২ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটিতে নিশ্চিতভাবে ৭৮১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
মরদেহের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এবং পর্যাপ্ত হিমায়িত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় নেপালি কর্তৃপক্ষ পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই দাফন শুরু করতে বাধ্য হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব নমুনার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এতে পরিবারগুলো নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সুযোগ পাবে।
স্বজন হারানো বহু মানুষ মরদেহ শনাক্তকেন্দ্রে ভিড় করছেন। সেখানে উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি এলইডি স্ক্রিনে প্রদর্শন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মরদেহের ভয়াবহ অবস্থা দেখে স্বজনরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন এবং চোখ বন্ধ করে ফেলছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক:
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া
সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ
অফিস: সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। ফোন: ০২৩৩৪৪০৭৩৮১, মোবাইল: ০১৭১৫-৬৮১১৪৮, সম্পাদক, সরাসরি: ০১৭১২-২১৬২০২, Email: laksambarta@live.com, s.bhouian@live.com