
ষ্টাফ রিপোর্টার\ কুমিল্লায় অত্যধিক হারে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনায় সমাজে বেড়েছে উদ্বেগ-আতংক। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও কখনো কখনো জামিন অযোগ্য অপরাধ হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে জামিন পেয়ে যাচ্ছে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তরা। জামিনে বেরিয়ে মামলা তুলে নেয়ার প্রভাব বিস্তারের ঘটনাও ঘটছে। এর ফলে ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগী নারী বা শিশুর পরিবার বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন।
আইনজ্ঞ ও নারী সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, চরম নৈতিক অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতি, বিচারহীনতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় সমাজে বাড়ছে ধর্ষণ এবং তা বন্ধ বা কমিয়ে আনার জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থায় দরকার সামাজিক ও রাজনৈতিক কালেকটিভ এফোর্ট।
গত বছরের ২৬শে জুন কুমিল্লার মুরাদনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক নারীকে ধর্ষণ ও পাশবিক নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। আলোচিত মুরাদনগরের ধর্ষণকান্ডের ঘটনার পর সামাজিকভাবে আতংক বেড়ে যায় এবং মানুষ ভেবেছিল ধর্ষণের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকার ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজ করবে এবং একইভাবে নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ পরিস্থিতি উত্তরণে কুমিল্লা থেকেই সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হবে। অথচ মুরাদনগরের ধর্ষণকান্ডের ঘটনার পরবর্তী ৬ মাসে (২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর) কুমিল্লায় ৬৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে একই বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সংগঠিত হয়েছে ৮২টি ধর্ষণের ঘটনা।
থানায় মামলার রেকর্ড অনুযায়ি গেল বছর কুমিল্লায় ১৪৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই সংখ্যা আরো বেশি বলে মনে করছেন কুমিল্লার মানবাধিকার কর্মী ও নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারিরা। তাদের মতে, ধর্ষণের সব ঘটনা মিডিয়ায় আসে না। কেবল আলোচিত ও সংঘবদ্ধ বা গণধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো মিডিয়া কভারেজ পায়। এরপরও কথিত সামাজিক সালিশ, ভয়ভীতির কারণে ধর্ষণের অনেক ঘটনাই লোকাল মিডিয়া দিতে পারছে না।
কুমিল্লায় বিদায়ী বছরে আশংখাজনক হারে বেড়েছে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ। জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির তথ্যানুযায়ি জানুয়ারি মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৩টি, ফেব্রæয়ারি মাসে ৬টি, মার্চ মাসে ১৯টি, এপ্রিল মাসে ১৭টি, মে মাসে ১২টি, জুন মাসে ১৫টি, জুলাই মাসে ৮টি, আগস্ট মাসে ১০টি, সেপ্টেম্বর মাসে ১৬টি, অক্টোবর মাসে ১২টি, নভেম্বর মাসে ৬টি এবং ডিসেম্বর মাসে ১১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে কিছু ধর্ষণের ক্ষেত্রে ধর্ষক তার লালসা চরিতার্থ করে ওই নারী বা শিশুকে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে।
এদিকে ২০২৪ সালের তুলনায় বিদায়ী বছর ২০২৫ সালে অন্তত ৫০টি ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করছেন কুমিল্লার সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষক, আইনজীবী, নারী নেত্রীরা। তাদের মতে, এধরণের মামলার দুর্বল তদন্ত ও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অভিযুক্তদের পার পেয়ে যাওয়ায় বা কঠোর সাজা না হওয়ায় ধর্ষণ এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতামূলক অপরাধ প্রবণতা বেড়ে চলছে।
এবিষয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুন্যাল-১, কুমিল্লার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট বদিউল আলম সুজন বলেন, দেশের সকল আন্দোলন, সংগ্রামে নারীর উপস্থিতি সবসময়ই লক্ষ্যণীয়। কিন্তু গেল এক বছরে কুমিল্লায় ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি কেবল উদ্বেগজনক ও আতংকই নয়; এটি সমাজের বিবেকবান সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে আশাহত করেছে। এভাবে ধর্ষণ ও নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে চরম নৈতিক অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতি, বিচারহীনতা। আবার বিচারের দীর্ঘসূত্রতার মধ্যদিয়ে মানুষ অপরাধপ্রবণ হয়ে ধর্ষণই নয়; ধর্ষণ শেষে হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠছে।
এ ধরণের ঘটনায় স্বল্প সময়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত, নৈতিক অবক্ষয়রোধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিক বিকাশ বিষয়ক কর্মসূচি চালু করতে পারলে ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ অন্যান্য ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারে।
নারীর প্রতি সহিংসতা বিশেষ করে ধর্ষণের মতো ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ সব সময়ের। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বিগত যে কোনো সময়ের তুলনায় নাজুক হিসেবেই দেখছেন কুমিল্লার নারী সমাজের নেতৃবৃন্দ। এবিষয়ে জাতীয় মহিলা সংস্থা, কুমিল্লার সাবেক চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক ভিপি ড. জে এন লিলি বলেন, ‘প্রতিনিয়ত নানাভাবে ঘরে-বাইরে ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন নারী। এ থেকে বাদ পড়ছে না কন্যা শিশুরাও। সামাজিক অবক্ষয় ও অস্থিরতার কারণে ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশুরা। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রম অবনতি ও ভুক্তভোগীরা ন্যায় বিচার না পাওয়া, আবার বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের মতো অপরাধ করে সহজে জামিন পেয়ে যাওয়ায় অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে কুমিল্লায় ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে ওইসব কারণ রয়েছে বলে আমি মনে করি। ধর্ষণের ব্যাপারে যদি আলাদা সেল, মামলার গতি তদারকি করা হয় তাহলে এ ধরনের অপরাধ অনেকটা কমতে পারে। ধর্ষণের মতো উদ্বেগজনক এ বিষয়টি প্রতিরোধে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও দরকার একটা কালেকটিভ এফোর্ট।
সম্পাদক ও প্রকাশক:
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া
সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ
অফিস: সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। ফোন: ০২৩৩৪৪০৭৩৮১, মোবাইল: ০১৭১৫-৬৮১১৪৮, সম্পাদক, সরাসরি: ০১৭১২-২১৬২০২, Email: laksambarta@live.com, s.bhouian@live.com