
মানুষের কৌতূহলের ইতিহাস যত পুরোনো, মহাবিশ্বকে জানার চেষ্টা ততই গভীর। রাতের আকাশে অসংখ্য তারা আর গ্যালাক্সির দিকে তাকিয়ে যুগে যুগে মানুষের মনে একই প্রশ্ন জেগেছে—এই বিশাল মহাবিশ্বের কি কোনো সীমানা আছে, নাকি এটি অসীম?
বিজ্ঞানীরা বলেন, মহাবিশ্ব বলতে আমরা যা বুঝি, তা হলো সবকিছু—গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ব্ল্যাক হোল, এমনকি সময় ও স্থানও এর অংশ। বর্তমান বৈজ্ঞানিক ধারণা অনুযায়ী, প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের সূচনা হয়। এই ঘটনাটি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ঘটেনি; বরং পুরো মহাবিশ্বই একসঙ্গে প্রসারিত হতে শুরু করে। ফলে মহাবিশ্বের কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্র আছে—এমন ধারণাও বিজ্ঞান সমর্থন করে না।
মহাবিশ্বের সীমানা নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “সীমাবদ্ধ” ও “সীমাহীন” ধারণার পার্থক্য। কোনো কিছু সীমাবদ্ধ হলেও তার প্রান্ত নাও থাকতে পারে। যেমন পৃথিবীর পৃষ্ঠ—এর আয়তন নির্দিষ্ট, কিন্তু আপনি হেঁটে চলতে থাকলে কোনো প্রান্তে পৌঁছাতে পারবেন না। একইভাবে মহাবিশ্বও এমন হতে পারে, যার আকার নির্দিষ্ট হলেও তার কোনো প্রান্ত নেই।
বিজ্ঞানীরা যে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, তাকে বলা হয় দৃশ্যমান মহাবিশ্ব। এর বিস্তার প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। তবে এর বাইরে কী রয়েছে, তা এখনো অজানা। কারণ মহাবিশ্বের বয়স সীমিত এবং আলো চলতে সময় নেয়, ফলে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের বাইরে আমরা দেখতে পাই না। তাই আমাদের দেখার সীমা থাকলেও, মহাবিশ্বের প্রকৃত সীমানা আছে কিনা—তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
বিশ শতকের শুরুতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল দেখান যে মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। গ্যালাক্সিগুলো একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই সম্প্রসারণ শুধু চলছে না, বরং দ্রুততর হচ্ছে। এর পেছনে কাজ করছে এক রহস্যময় শক্তি, যাকে বলা হয় ডার্ক এনার্জি। এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের ধারণাকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং ইঙ্গিত দেয় যে মহাবিশ্ব হয়তো অনন্তকাল প্রসারিত হতে থাকবে।
মহাবিশ্বের গঠন কেমন—এ নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব রয়েছে। কোনো তত্ত্বে বলা হয় মহাবিশ্ব সমতল ও অসীম, আবার কোনো তত্ত্বে এটি গোলাকার ও সীমাবদ্ধ হলেও প্রান্তহীন। বর্তমান পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মহাবিশ্ব প্রায় সমতল, যা থেকে ধারণা করা হয় এটি অসীমও হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
মহাবিশ্বের সীমানা নিয়ে প্রশ্ন শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, দার্শনিক দিক থেকেও তা গুরুত্বপূর্ণ। যদি মহাবিশ্বের শেষ থাকে, তাহলে তার বাইরে কী আছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ নতুন করে ভাবতে শুরু করে। আবার যদি মহাবিশ্ব অসীম হয়, তাহলে বাস্তবতার ধারণাও নতুনভাবে বিবেচনা করতে হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মহাবিশ্বের কোনো সীমানা আছে কিনা—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আধুনিক বিজ্ঞান ইঙ্গিত দিচ্ছে, মহাবিশ্ব হয়তো এমন এক বাস্তবতা, যার শেষ নেই, কিংবা থাকলেও তা আমাদের কল্পনার বাইরে। নতুন নতুন গবেষণা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত এই রহস্যের আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। হয়তো একদিন এই প্রশ্নেরও নির্ভুল উত্তর পাওয়া যাবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক:
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া
সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ
অফিস: সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। ফোন: ০২৩৩৪৪০৭৩৮১, মোবাইল: ০১৭১৫-৬৮১১৪৮, সম্পাদক, সরাসরি: ০১৭১২-২১৬২০২, Email: laksambarta@live.com, s.bhouian@live.com