
\ মোঃ ইয়াছিন মজুমদার \
যখন এদেশের পরীক্ষার হলগুলোতে নকলে সয়লাভ ছিল, শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে নকল দুর হবে এটা কল্পনাও করা যায়নি। এ বিধ্বংসী অবস্থা থেকে জাতিকে বাঁচানোর পেছনে, নকল উচ্ছেদের পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী জনাব এহছানুল হক মিলন।
সম্প্রতি মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়ের একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি। তিনি বলেছেন মাদ্রাসা শিক্ষা আলিয়া হোক, কাওমী হোক অনেক পিছিয়ে আছে। কিছু ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম দ্বিতীয় বা মেধা স্থান অর্জন করছে এটা দিয়ে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা যাচাই করা যায় না। দু’চারটি মাদ্রাসা থেকে ভালো ছাত্র বের হলেও অধিকাংশ মাদ্রাসার অবস্থাই খারাপ, তারা আরবিতেও পারদর্শী হচ্ছে না। ক্যাডেট কলেজ, সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত কলেজ, নটরডেম কলেজ এ ধরনের নামকরা কলেজগুলোর সাথে পাল্লা দেয়ার মত মাদ্রাসা নেই বললেই চলে। আমি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের মন্তব্যের সাথে একমত, তবে এর পেছনে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা অনেকটা দায়ী বিষয়টি আমি নিচে তুলে ধরছি।
১) এনটিআরসিএ এর শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রিলিমিনারিতে আরবি প্রশ্ন থাকে না বললেই চলে, ফলে আরবিতে দুর্বল জেনারেল বিষয়ে ভালো যারা তারা মাদ্রাসার শিক্ষক হচ্ছেন। শিক্ষক আরবীতে দুর্বল হলে ছাত্র আরবীতে ভালো হবে কিভাবে?
২) সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত ক্যাডেট স্কুল আছে কিন্তু সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত ক্যাডেট মাদ্রাসা নেই। সারাদেশের মেধাবী ছাত্ররা ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতা করে, সেখান থেকে অতি মেধাবীদের ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করা হয়। স্বাভাবিকভাবে তাদের ফলাফল ভালো হবে। আমার জানা মতে কিছু ছাত্র এমন রয়েছে যারা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় টিকেনি, তাই তারা সাধারণ স্কুল-কলেজে পড়ে পরবর্তী ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, অর্থাৎ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মতো মেধাবী ছাত্রদের থেকেও অধিক মেধাবীদেরকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করা হয়। আমাদের মফস্বলের অনেক অভিভাবক প্রতিষ্ঠান এসে নিজের ছেলের খোঁজ করলে উনাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় আপনার ছেলে কোন শ্রেণীতে পড়ে তিনি বলতে পারেন না, ছেলের রোল নং জিজ্ঞেস করলে তাও বলতে পারেন না। ওই সকল ছাত্রদেরকে আমরা শিক্ষকরা নার্সিং করে যতটুকু করছি যদি এ ধরনের ছাত্রদেরকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করা হতো তখনই বুঝা যেত যে ক্যাডেট কলেজের নিজস্ব কৃতিত্ব কতটুকু? যে ছেলেটি ক্যাডেট কলেজ বা নটরডেমের মতো নামকরা প্রতিষ্ঠান থেকে জিপিএ ফাইভ পাচ্ছে সে ছেলেটি মফস্বল থেকেও জিপি ফাইভ পেত। তবে সেখানে নিয়ম শৃঙ্খলা, চেইন অফ কমান্ড ইত্যাদি কারণে ভাল ছাত্ররা আরো ভালো হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই সরকারি উদ্যোগে ক্যাডেট মাদ্রাসা স্থাপন সময়ের দাবি।
৩) মাদ্রাসায় ভালো আলেম তৈরি করাই উদ্দেশ্য, কিন্তু সিলেবাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন, আরবি বিষয় যতটুকু আছে, সাধারণ বিষয়ের বোঝা তার চেয়ে বেশী, যা ভালো আলেম হওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও প্রতিবন্ধক।
৪) বিসিএসসহ সরকারি চাকরির পরীক্ষায় মাদ্রাসার আরবি বিষয়গুলো থেকে ১% প্রশ ও থাকে না, ফলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা আরবীকে প্রাধান্য না দিয়ে জেনারেল বিষয়কে প্রাধান্য দেয়, কারণ একজন ছাত্র যখন বুঝতে শিখে তার কর্মক্ষেত্র শুধু সস্তা শ্রমের মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিন ও মাদ্রাসার শিক্ষক হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হলে হবে না, দেশের অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হলে তাকে আরবীকে প্রাধান্য না দিয়ে সাধারণ বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে, ফলে আরবি হয়ে যায় তার কাছে এডিশনাল। সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য অথবা দিয়ে হলেও কিছু আরবি বিষয়ের প্রশ্ন সংযোজিত থাকলে তখন সে মাদ্রাসার আরবিকেও প্রাধান্য দিতো।
৫) মাদ্রাসার আরবি বিষয়ে পারদর্শী হলেও সরকারি চাকরির সুবিধা না থাকায় মেধাবীরা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পর সাধারণ শিক্ষা চলে যায়। মাদ্রাসায় থাকছে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা। এ কম মেধাবীরা আরবিতেও দুর্বল হবে, সাধারণ বিষয়েও দুর্বল হবে এটা স্বাভাবিক। আমার এক সন্তান ও তার এক সহপাঠী লাকসামের মফস্বলের একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল (এসএসসি) পাস করে, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা টঙ্গী শাখায় ভর্তি হয় সেখান থেকে আলিম (এইচ এস সি) পাশ করে। তারা দু’জনেই আরবিতে ভালো ছিল, আরবিতে ও ইংরেজিতে বক্তৃতা দিত, আরবি গ্রামারে ভালো ছিল, তারা মাদ্রাসায় থাকলে হয়তো মুহাদ্দিস মুফাসসির হতো, কিন্তু আমার ছেলেটি সরকারি মেডিকেলে, তার সহপাঠি ইলেকট্রিক এন্ড ইলেকট্রনিক্স বিষয়ে বুয়েটে ভর্তি হয়ে যায়। যতটুকু জেনেছি ওই বছর সে মাদ্রাসা থেকে ২২ জন ছাত্র মেডিকেলে সুযোগ পায়। আমার আরেক ছেলে ও মাদ্রাসা থেকে পাস করে এখন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়ছে। দেশের অধিকাংশ মাদ্রাসা থেকেই প্রতিবছর মেধাবীরা বিশ্ববিদ্যালয় অনার্স পড়তে চলে যাচ্ছে। যদি সরকারি চাকরিতে অথবা দিয়ে হলেও মাদ্রাসার আরবি বিষয়ের কিছু প্রশ্ন থাকতো তবে তাদেরকে মাদ্রাসা ছেড়ে চলে যেতে হতো না, মাদ্রাসা আরবীতে পারদর্শী কিছু আলেম পেত। সে সাথে দেশ পেতো কিছু আলেম প্রশাসক।
৬) জনবল ও অবকাঠামোগত বৈষম্যঃ ধরুন একটি ফাযিল মাদ্রাসা, সেখানে ১ম শ্রেনী থেকে ৫ম পর্যন্ত (ইবতেদায়ী) প্রাথমিক স্তর, ৬ষ্ট থেকে ১০ম মাধ্যমিক স্তর, একাদশ দ্বাদশ ও ডিগ্রি স্তর তিনটি স্তর একত্রে আছে, একত্রে থাকা সমস্যা নয়। কিন্তু স্তর অনুযায়ী শিক্ষক ও জনবল এমনকি ভবন বরাদ্ধ দেয়া হয় না। যেমন আমার মাদ্রাসা ফাযিল পর্যন্ত, পাশে একটি প্রাইমারি স্কুল ১ম থেকে ৫ম পর্যন্ত, সেখানে শিক্ষক ১৩ জন। অথচ ফাযিল মাদ্রাসার জনবল কাঠামোতে ১ম থেকে ৫ম পর্যন্তের জন্য শিক্ষক বরাদ্ধ মাত্র ৪ জন। কোন বিরতি ছাড়া ক্লাশ নিলেও ৫ জন শিক্ষক লাগে, আর বিরতিসহ জন ৪/৫ পিরিয়ড ক্লাশ নিলে ৮ জন শিক্ষক লাগে। ভবন বরাদ্ধে প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল, কলেজ তিনস্তর তিনটি ভবন বরাদ্ধ পায়, কিন্তু মাদ্রাসা তিনস্তর মিলে একটি ভবন বরাদ্ধ পায়। গত সরকারের আমলে আমাদের লাকসাম উপজেলার সকল স্কুল কলেজ ভবন পেয়েছে, লাকসাম ন,ফ সরকারি কলেজে শতকোটি টাকা ব্যয়ে ৭টি ভবনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ হয়েছে, অথচ লাকসাম উপজেলার ১৯টি এমপিও ভুক্ত মাদ্রাসার মধ্যে ভবন পেয়েছে মাত্র ৫টি মাদ্রাসা।
৭) দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। প্রাইমারি স্কুলগুলো হাইস্কুল কলেজের ছাত্র যোগানের মূল উৎস। ফলে স্কুল কলেজে শিক্ষার্থী বেশি। বেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে শতকরা হারে মেধাবীর সংখ্যা বেশি হবে। দেশে কোথাও একটিও সরকারি প্রাথমিক (ইবতেদায়ী) মাদ্রাসা নেই, ফলে ছাত্র সংখ্যা কম হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে শতকরা হিসেবে মেধাবীর সংখ্যা কম হবে। সরকারি মাদ্রাসা রয়েছে মাত্র ৩টি, মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা অপ্রতুল বিশেষ করে ইবতেদায়ী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
৮) স্কুলে শিক্ষার্থী বেশি হলে শ্রেণী শাখা করার এবং শাখা শিক্ষকদের এমপিও ভুক্ত করে বেতন দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে মাদ্রাসায় শাখা শিক্ষক বেতন ভুক্ত হতে দেখি না।
৯) সেনা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে ফলাফল যত ভালো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে তত ভালো নয়, কারণ চেইন অফ কমান্ড, নিয়ম শৃঙ্খলা। আমাদের দেশে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কি কোন ক্ষমতা আছে? ধরুন কোন শিক্ষক অনিয়ম করে, ফাঁকি দেয়। প্রধান শিক্ষক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কমিটির মিটিংয়ে উপস্থাপন করল। কিন্তু কমিটির লোক স্থানীয়, তারা যদি শিক্ষকের পক্ষে থাকে, তারা যদি রাজনৈতিক কারণে পক্ষে থাকে, যদি শিক্ষক থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে পক্ষে থাকে তখন উল্টো ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগ নেয়া প্রধান শিক্ষকের সম্মান নষ্ট হয়। এ কারণে নিয়ম শৃঙ্খলা নষ্ট হয়।
এভাবে অসংখ্য কারণে শুধু মাদ্রাসা নয় পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থার চিত্র বেশি ভালো নয়। আশা করি শিক্ষার মানোন্নয়নে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। লেখকঃ অধ্যক্ষ, ফুলগাঁও ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা, লাকসাম, কুমিল্লা। মোবাইল নং ০১৯৭১৮৬৪৫৮৯
সম্পাদক ও প্রকাশক:
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া
সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ
অফিস: সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। ফোন: ০২৩৩৪৪০৭৩৮১, মোবাইল: ০১৭১৫-৬৮১১৪৮, সম্পাদক, সরাসরি: ০১৭১২-২১৬২০২, Email: laksambarta@live.com, s.bhouian@live.com