
\ ড. আলা উদ্দিন \
বিগত বছরও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অস্বস্তিকর ছিল। এ বছর কিছু ক্ষেত্রে তা আরো জটিল রূপ নিয়েছে। আগের রাজনৈতিক অস্থিরতার রেশ চলমান থাকায়, নানামুখী ঘাত-প্রতিঘাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেনি। ক্লাস, পরীক্ষা, প্রশাসনিক কাজ- সবকিছুতেই এক ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। শিক্ষা ঘিরে রাষ্ট্রের বড় লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি তৎপরতার জায়গায় যেন একটি শূন্যতা স্পষ্ট।
শিক্ষা খাত দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলার শিকার। তবে ২০২৫ সালে সেই অবহেলা আরো চোখে পড়েছে। কারণ সংকটগুলো একের পর এক সামনে এসেছে। রাষ্ট্র সংস্কারের নানা আলোচনা থাকলেও শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আলাদা কোনো বড় উদ্যোগ বা কমিশনের অনুপস্থিতি বিস্ময় তৈরি করেছে।
বিভিন্ন খাতে কমিশন গঠনের ঘোষণায় জনপরিসরে আশাবাদ দেখা গেলেও শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে একই মাত্রার গুরুত্ব না থাকায় হতাশা বাড়ে। অথচ শিক্ষা কোনো একটি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সমাজবদলের প্রধান হাতিয়ার। শিক্ষা দুর্বল হলে কর্মসংস্থান, সামাজিক আস্থা, নাগরিকত্ববোধ- সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়ে।
গত বছরের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল শিক্ষক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। প্রাথমিক থেকে মাদরাসা ও উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকরা বেতনকাঠামো, মর্যাদা এবং চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে রাজপথে নামেন। দাবিগুলো ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় মিল ছিল- শিক্ষকরা মনে করেছেন, তাঁদের ন্যায্য দাবি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত। শিক্ষক অসন্তোষ যখন দীর্ঘায়িত হয়, তার প্রভাব সরাসরি পড়ে শ্রেণিকক্ষে। শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকই মূল চালিকাশক্তি। ফলে তাঁদের সংকট মানেই পুরো ব্যবস্থার সংকট।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমস্যার সমাধান প্রায়ই দেরিতে আসে কিংবা আসে খন্ডিতভাবে। সময়মতো আলোচনা, বিশ্বাস তৈরির উদ্যোগ এবং স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না থাকলে ছোট সংকটও বড় হয়ে ওঠে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত শৃঙ্খলায় চলতে না পারলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ালেখার আগ্রহ কমে যায়, আর পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ বাড়ে। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই শিক্ষার্থীরা, যারা ঘরে পড়াশোনার সহায়তা কম পায় বা অতিরিক্ত খরচ বহন করতে পারে না। ফলে বৈষম্য আরো গভীর হয়।
শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্দোলন, রাস্তায় শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের অবস্থান, পুলিশের অযাচিত হস্তপে- এসব ২০২৫ সালের শিক্ষাঙ্গনের একটি অস্বস্তিকর অধ্যায় হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মূল সমস্যার চেয়ে যোগাযোগের ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময়রেখা, একাডেমিক ভবিষ্যৎ, ডিগ্রির স্বীকৃতি বা প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট বার্তা না থাকলে ভুল ধারণা তৈরি হয়। পরে সেই ভুল ধারণাই ক্ষোভে রূপ নেয়, আর ক্ষোভ জায়গা করে নেয় রাজপথে।
অভিজ্ঞতাগুলো দেখায়, বড় কোনো শিক্ষানীতি বা প্রশাসনিক পরিবর্তন কেবল ঘোষণার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায় না। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কলেজ প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সব পক্ষকে আলোচনায় আনতে হয়। তথ্যের স্বচ্ছতা এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন না থাকলে সিদ্ধান্ত যতই যুক্তিযুক্ত হোক, অংশীজনরা নিজেদের নিরাপত্তাহীন মনে করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে শিক্ষার্থী আন্দোলন দ্রæত জনজীবনে প্রভাব ফেলে। যানজট বাড়ে, কাজের ক্ষতি হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বিরক্তি জন্মায়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিও অনেক সময় জনসমর্থন হারায়।
২০২৫ সালে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়নের যে অস্বাভাবিক চিত্র দেখা গেছে, তা শিক্ষাঙ্গনের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীলদের পদত্যাগ বা অপসারণ যদি নিয়মতান্ত্রিক না হয়, তাহলে একাডেমিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছাত্ররাজনীতি বাংলাদেশের বাস্তবতা হলেও একাডেমিক সিদ্ধান্ত যদি আবেগ ও চাপের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে স্থিতিশীলতার বদলে অস্থিরতাই স্থায়ী হয়।
শিক্ষাক্রম নিয়েও বছরজুড়ে অনিশ্চয়তা ছিল। একদিকে আগের শিক্ষাক্রম বাতিল করে পুরনো ধারায় ফেরার সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে সংশোধিত নতুন শিক্ষাক্রম চালুর সময়সূচি বারবার পিছিয়ে যাওয়া- এই দোলাচল শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের মধ্যেই বিভ্রান্তি তৈরি করে। শিক্ষাক্রম পরিবর্তন মানে শুধু বই বদলানো নয়, এর সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়নপদ্ধতি, শ্রেণিকক্ষের উপকরণ- সব কিছু জড়িত।
পাঠ্যবই বিতরণে দেরির বিষয়টিও এখানে শুধু লজিস্টিক সমস্যা নয়, বরং ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা। বছরের শুরুতে বই না পেলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে। কারণ তাদের জন্য স্কুলই প্রধান ভরসা। শহরে বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকায় সেই সুযোগ সীমিত। বই বিতরণে দেরি হলে শিক্ষক পরিকল্পনা অনুযায়ী পড়াতে পারেন না, পরীক্ষা পেছাতে হয় বা তাড়াহুড়া করে শেষ করার চাপ তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পাঠদানের মানে। যদি নতুন শিক্ষাবর্ষেও একই ধরনের দেরির আশঙ্কা থাকে, তাহলে বোঝা যায় সমস্যাটি কাঠামোগত।
২০২৫ সালের শিক্ষা সংকটগুলো আলাদা মনে হলেও ভেতরে একটি সাধারণ বিষয় কাজ করেছে- আস্থা। শিক্ষার্থী আস্থা হারালে ক্লাসে উপস্থিতি কমে, শিক্ষক আস্থা হারালে পাঠদানের অনুপ্রেরণা কমে, অভিভাবক আস্থা হারালে শিক্ষার বাইরে ব্যয় বাড়ে। আর সমাজ আস্থা হারালে শিক্ষাকে উন্নতির সিঁড়ি হিসেবে দেখার প্রবণতা দুর্বল হয়। সময়মতো সিদ্ধান্ত, স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং ন্যায্যতার চর্চাই আস্থা তৈরি করে। যখন তা অনুপস্থিত থাকে, তখন ছোট ঘটনাও বড় সংকটে রূপ নেয়।
শিক্ষক উন্নয়ন ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, কর্মপরিবেশ ও বেতনকাঠামো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে শিক্ষামানের উন্নতি টেকসই হয় না। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শাসনকাঠামোকে নিয়মতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে, যাতে সিদ্ধান্ত চাপের ওপর নয়, নীতির ওপর দাঁড়ায়। শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের আগে পর্যাপ্ত পাইলটিং, প্রশিক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ দরকার। দ্রæত প্রতিক্রিয়ার বদলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই শিক্ষাব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতে পারে। জাতীয় শিক্ষার সংকটকে কেবল শিক্ষা খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর প্রভাব সমাজের সব স্তরে পড়ে। শেখার মান কমলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয় না, চাকরির বাজারে অস্থিরতা বাড়ে, আর তরুণদের মধ্যে হতাশা জমে। একই সঙ্গে শিক্ষা যদি বারবার অস্থিরতায় পড়ে, তাহলে পরিবারগুলো আরো বেশি অনিশ্চয়তায় ভোগে। ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা তাই একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। শিক্ষা অবহেলায় থাকলে সমাজবদলের আকাঙ্খা বাস্তবে রূপ নেয় না। শিক্ষা যতটা সংস্কার চায়, তার চেয়েও বেশি চায় ধারাবাহিক মনোযোগ, নিয়মতান্ত্রিকতা এবং আস্থা ফিরিয়ে আনার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদক ও প্রকাশক:
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া
সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ
অফিস: সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। ফোন: ০২৩৩৪৪০৭৩৮১, মোবাইল: ০১৭১৫-৬৮১১৪৮, সম্পাদক, সরাসরি: ০১৭১২-২১৬২০২, Email: laksambarta@live.com, s.bhouian@live.com