
মোঃ আবদুল হান্নানঃ সমাজ হলো মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের এক বিশাল কাঠামো, যেখানে একে অপরের প্রতি বোঝাপড়া, সহমর্মিতা এবং সহনশীলতা অপরিহার্য। মানুষের জীবন শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সাফল্য বা প্রফুল্লতার জন্য নয়; এটি সামাজিক বন্ধন, সহযোগিতা ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেও গঠিত হয়। ইসলামে সহনশীলতা এবং সহমর্মিতা কেবল নৈতিক গুণাবলী নয়, বরং এটি সমাজে শান্তি, সমতা ও মানবিক সম্পর্কের ভিত্তি।
সহনশীলতা বা ধৈর্য ও নম্রতা মানুষের মধ্যে শিষ্টাচার ও সামাজিক বন্ধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর তারা রহমানের বান্দা, যারা যমীনের বুকে নম্রভাবে চলা-ফিরা করে এবং অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদেরকে সম্বোধন করলে (উপেক্ষা করে) বলে, সালাম।” (আল-কুরআন, ২৫:৬৩) এটি সমাজে সহনশীলতার গুরুত্ব স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। একজন মানুষ যদি অন্যের ভুলের প্রতি সহনশীল হয়, তবে সামাজিক দ্ব›দ্ব ও বিরোধ কমে আসে। সহনশীলতা মানুষের মনকে প্রশান্ত রাখে এবং এটি অন্যের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কাজ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন হাদীসে সহনশীলতার গুরুত্ব নির্দেশ করেছেন। আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যাক্তি আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। যে ব্যাক্তি আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে সে যেন তার মেহমানের সম্মান প্রদর্শন করে। আর যে ব্যাক্তি আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে সে যেন ভাল কথা বলে অন্যথা চুপ থাকে।” (সহীহ মুসলিম) এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, সহনশীলতার মাধ্যমে আমরা সমাজে ন্যায় এবং মানবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারি।
সহমর্মিতা মানুষের সামাজিক জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। এটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে বৃহত্তর সমাজে মানবিক মূল্যবোধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক। হাদীসে বলা হয়েছে: আবদুল্লাহ্ ইবন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রহমকারীদের উপর রাহমান অর্থাৎ আল্লাহ্ রহম করেন। তোমরা যমীনবাসীদের উপর রহম কর, তাহলে আসমানের অধিপতি আল্লাহ্ তোমাদের উপর রহম করবেন।” (সুনান আবূ দাউদ) এ হাদীস আমাদের শেখায়, অন্যের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা প্রদর্শন কেবল আধ্যাত্মিক গুণাবলী নয়, এটি সমাজে শান্তি ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক। এছাড়াও সহমর্মিতা সমাজে আস্থা এবং সহায়তার সংস্কৃতি তৈরি করে।
যখন মানুষ একে অপরের দুঃখ-কষ্ট ও সমস্যায় সহমর্মিতা দেখায়, তখন সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়। উদাহরণস্বরূপ, দারিদ্র্য, অসহায়তা বা সংকটের সময় একজন মুসলিম যদি তার শক্তি অনুযায়ী অন্যের সাহায্য করে, তাহলে সমাজে বিশ্বাস, সমবায় এবং সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ ততক্ষন পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষন আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল লোকদের চাইতে অধিক প্রিয় না হব।” (সুনান আদ দারেমী) এ হাদীসে নির্দেশ করে যে সহমর্মিতা কেবল নৈতিক দিক নয়, এটি সামাজিক সংহতি ও শান্তি স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
সর্বোপরি, সমাজে সহনশীলতা ও সহমর্মিতার চর্চা ব্যাপক প্রভাব ফেলে। প্রথমত, এটি সামাজিক দ্ব›দ্ব কমায়। সহনশীল মানুষ অন্যের ভুল বা অনাকাক্সিত আচরণকে সহজভাবে মেনে নেয়। এটি বিরোধ ও শত্রæতার জন্মকে সীমিত করে এবং সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ প্রশস্ত করে। দ্বিতীয়ত, সহমর্মিতা মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করে। একটি সমাজ যেখানে মানুষ একে অপরের দুঃখ, কষ্ট ও সমস্যার প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, সেখানে সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী হয়। উদাহরণস্বরূপ, বিপদের সময়ে একে অপরের সাহায্য, রোগ বা দারিদ্র্য সহনশীলভাবে সমাধান করার মানসিকতা সমাজকে সুরক্ষিত এবং স্থিতিশীল রাখে। তৃতীয়ত, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা মানুষের ব্যক্তিগত উন্নয়নেও ভ‚মিকা রাখে। একজন সহমর্মী মানুষ নিজের অভ্যাসে ধৈর্য, নম্রতা এবং মানবিক চিন্তা বিকাশিত করে।
এটি কেবল তার নৈতিকতা উন্নত করে না, বরং সমাজে ইতিবাচক প্রভাবও ফেলে।
ইসলামে সহনশীলতা ও সহমর্মিতা কেবল নৈতিক আদর্শ নয়, এটি বাস্তব জীবনে প্রতিদিন প্রয়োগের নির্দেশ দেয়।
কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী, একজন মুসলিমের উচিত: প্রতিবেশীর সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা। দুঃস্থ ও অসহায়ের সাহায্য করা। দ্ব›দ্ব ও বিরোধে না জড়িয়ে ধৈর্য ধারণ করা। সমাজে সম্প্রীতি বৃদ্ধি করা। নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়িতত্ব পালনে সহমর্মিতা প্রদর্শন করা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, মক্কার কাফেররা নবুওয়াতের প্রাথমিক দিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর নাম উচ্চারণারীদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে। জুলুম উৎপীড়নের এমন কোনো পদ্ধতি ছিল না, যা ওরা প্রয়োগ করেনি। অবশেষে ওরা তাঁকে স্বদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর পথে আমাকে এত ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে যে, আল্লাহর জন্য আমাকে এত যাতনা দেয়া হয়েছে যে, আর কাউকে এত যাতনা দেয়া হয়নি। এক নাগাড়ে ত্রিশটি দিন ও রাত্র এমনও অতিবাহিত হয়েছে যে বিলালের বগলের তলে রক্ষিত সামান্য খাদ্য ছাড়া আমার ও বিলালের জন্য এতটুকু খাদ্যও ছিল না যা কোন প্রাণী খেতে পারে। (সহীহ ইবন মাজাহ, সুনান আত-তিরমিজী) এতকিছুর পরেও মক্কা বিজয়ের পর ইসলামের এই জঘন্য শত্রæদল পুরোপুরিভাবে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর দয়া ও কৃপার পাত্র হয়ে পড়ে। তার একটি অঙ্গুলির ইশারা ওদের সবাইকে রক্তগঙ্গায় ভাসিয়ে দিতে পারত। কিন্ত তিনি সহনশীলতা ও সহমর্মিতা দেখিয়েছিলেন।
সমাজে সহনশীলতা ও সহমর্মিতার চর্চা কেবল নৈতিক উন্নয়নই নয়, বরং এটি সমাজের স্থিতিশীলতা, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কুরআন ও হাদীসের শিক্ষায় স্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে সহনশীলতা ও সহমর্মিতা মানব জীবনের অপরিহার্য দিক। আল-কুরআন আমাদের শেখায় শান্তিপূর্ণ আচরণ ও নম্রতার মূল্য, আর হাদীস আমাদের নির্দেশ করে করুণা ও অন্যের প্রতি সহমর্মিতার গুরুত্ব। এই গুণাবলী চর্চার মাধ্যমে সমাজে শান্তি, আস্থা, সহযোগিতা এবং ন্যায়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তাই প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব, নিজের জীবন এবং সমাজে সহনশীলতা ও সহমর্মিতার চর্চা করে মানবিক মূল্যবোধকে সমৃদ্ধ করা।
লেখকঃ অধ্যক্ষ, দৌলতগঞ্জ গাজীমুড়া কামিল মাদরাসা, লাকসাম, কুমিল্লা।
সম্পাদক ও প্রকাশক:
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া
সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ
অফিস: সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। ফোন: ০২৩৩৪৪০৭৩৮১, মোবাইল: ০১৭১৫-৬৮১১৪৮, সম্পাদক, সরাসরি: ০১৭১২-২১৬২০২, Email: laksambarta@live.com, s.bhouian@live.com