স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করলে শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে: তারেক রহমান

বিরোধিতার নামে স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ তৈরি করা হলে তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই বিরোধিতা হতে হবে গঠনমূলক এবং জনস্বার্থকেন্দ্রিক।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ ও আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, আর অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করছে। সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের দায়িত্ব হলো দেশের স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণে আলোচনা, যুক্তিতর্ক ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

তিনি বলেন, কেবল বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারি দলই শুধু জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, আর বিরোধী দল করে না—এমন ধারণা থেকে সরে আসা প্রয়োজন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সব রাজনৈতিক পক্ষেরই দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার দায়িত্ব রয়েছে।

বিরোধী দলের নেতাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সম্মান জানাতে সরকারের আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও শহীদ পরিবার ও আহত আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল তাঁদের।

তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যাঁরা রাজনৈতিক পরিচিতি পেয়েছেন, তাঁদের প্রতি সম্মান জানানো সবার কর্তব্য। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করতে হলে আত্মত্যাগকারীদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নেও কাজ করতে হবে।

জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্য গড়ার আহ্বান

গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করেন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন। গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক মতভিন্নতাকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব অবস্থান থাকতে পারে। এসব বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যই জনগণ তাঁদের সংসদে পাঠিয়েছেন। সংসদে যুক্তি ও মতামত তুলে ধরে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন ও জীবিকার সংগ্রাম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারেন।

কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করার তাগিদ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রত্যাশার মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে।

রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ পরিবেশে বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত করাও শহীদদের প্রত্যাশার অংশ ছিল। তাঁদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।

তারেক রহমান জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকার পর্যায়ক্রমে উদ্যোগ নিচ্ছে।

উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রকৃতি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব

ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি। তবে উন্নয়নকাজের কারণে প্রকৃতির ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। নতুন স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।

সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিচ্ছন্নতার অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও সরকারি হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকাগুলোতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আরও মনোযোগ প্রয়োজন।

হাসপাতালে রোগীদের স্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পরিবেশ সচেতনতায় দৃষ্টান্ত স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, পরিবেশদূষণ ও অপরিচ্ছন্নতা রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়ায়। পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও ওসমানী উদ্যানের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দর্শনার্থীদের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি। এসব স্থাপনাকে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নাগরিকদের সহযোগিতাও প্রয়োজন।

উদ্বোধন হলো ৯০ ফুট উঁচু জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ

সোমবার সকাল ১০টার দিকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন তিনি।

উদ্বোধনের পর স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যান উদ্বোধন করে বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং উদ্যানসংলগ্ন গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি ৯০ ফুট উঁচু এবং প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। এতে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।

স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু এবং ভেতরের দিকে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে সাত ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। এসব ভাস্কর্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

আধুনিক সুবিধায় সাজানো হয়েছে ওসমানী উদ্যান

পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় তৈরি করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ গড়ে তোলা হয়েছে।

উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা ও জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য স্থাপন করা হয়েছে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থা। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটিতে সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথও রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল আলম বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান এবং শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ হাবিবসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *