
ষ্টাফ রিপোর্টার\ নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরছে না ক্রেতাদের। সরবরাহ সংকট ও বাড়তি পরিবহন খরচের অজুহাতে বাজারগুলোতে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সয়াবিন তেল ও চিনি। চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম, পেঁয়াজ, আটা-ময়দা ও প্রায় সব ধরনের সবজি।
প্রতি কেজি প্যাকেটজাত চিনির গায়ে ১১০ টাকা দাম লেখা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ২০৪ টাকা হলেও কোথাও কোথাও ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ২১০ টাকা। সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি লাভের মার্জিন কম হওয়ায় অনেক খুচরা বিক্রেতা তেল বিক্রিতেও অনীহা দেখাচ্ছেন।
অন্যদিকে, গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়ে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। ফার্মের মুরগির ডিমের ডজন ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা, আর পাড়া-মহল্লার দোকানে চারটি ডিম কিনতেই খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৫ টাকা।
এদিকে, শীত মৌসুম আসন্ন হলেও সবজির দাম কমার পরিবর্তে চড়া রয়েছে। বাজারে প্রতি কেজি শিম ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, বেগুন ১০০ টাকা, করলা ও শসা ৮০ টাকা এবং গাজর ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আটা ও ময়দার দামও কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
তবে বাজারে ডিম ও মুরগির উৎপাদন বাড়লেও খামার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, উৎপাদন খরচ এবং ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ডিমের খুচরা দামের সঙ্গে খামারির প্রাপ্ত দামের বড় ব্যবধানের পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা রয়েছে।
বাজার ঘুরে জানা যায়, গত দুই-তিন সপ্তাহের তুলনায় সয়াবিন তেল, চিনি ও ডিমের দামে উল্লেখ করার মতো কোনো হেরফের হয়নি। বাজারে কোথাও বোতলজাত সয়াবিন তেল ও প্যাকেটজাত চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার যেসব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর দামও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি। কোথাও প্যাকেট কেটে খোলা চিনি বিক্রি করা হচ্ছে বাড়তি দামে।
বিক্রেতাদের ভাষ্য, পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হওয়ায় নির্ধারিত দামে বিক্রি করে খরচ পোষানো যাচ্ছে না। এ কারণে অনেক দোকানি প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি না করে প্যাকেট খুলে খোলা চিনি হিসেবে বিক্রি করছেন।
একই পরিস্থিতি সয়াবিন তেলের বাজারেও। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ২০৪ টাকা হলেও অনেক দোকানে তা বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকায়। সরবরাহ কম থাকায় কোথাও কোথাও বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু দোকানে তেল থাকলেও তা সহজে ক্রেতাদের সামনে রাখা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বাজারে এখন খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা ও পাম তেল ২০০ টাকা লিটারে। যা সরকার নির্ধারিত বোতলজাত সয়াবিন তেলের চেয়েও বেশি।
কয়েক সপ্তাহ ধরেই দাম বাড়ানোর জন্য বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমিয়ে রেখেছে কোম্পানিগুলো- এমন অভিযোগ খুচরা বিক্রেতাদের। তবে এরমধ্যে আরেকটি ভিন্ন বিষয়ও লক্ষ্য করা গেছে। মূলত লাভের মার্জিন কম হওয়ার কারণে সয়াবিন তেল বিক্রিতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরাও। যা বাজারে তেলের সংকট আরও প্রকট করেছে।
জানা গেছে, কোম্পানিগুলো আগে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের জন্য খুচরা বিক্রেতাদের ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত মুনাফা দিত। কিন্তু এখন সে মুনাফা হয়েছে লিটারপ্রতি মাত্র এক টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছে, এক লিটার তেল ২০৪ টাকা দাম, সেটা বিক্রি করে লাভ হয় এক টাকা। অর্থাৎ শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ লাভে কোনো পণ্য বেচাকেনা অসম্ভব। অনেকে এ বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি।
বাজারে পেঁয়াজের দামও বেড়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা বেড়ে ভালো মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। ফলে রান্নার অন্যতম প্রয়োজনীয় এ পণ্য কিনতেও ক্রেতাদের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।
এদিকে, ফার্মের মুরগির ডিমের দামেও স্বস্তি নেই। বিভিন্ন বাজারে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়। পাড়া-মহল্লার দোকানে চারটি ডিম কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৫ টাকা। সে হিসাবে ডজনের দাম দাঁড়াচ্ছে ১৬৫ টাকা।
স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জন্য ডিম তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষের উৎস হলেও কয়েক সপ্তাহ ধরেই বাড়তি দামের কারণে তাদের খরচ বেড়েছে।
তথ্য বলছে, কয়েক হাত ঘুরে ডিম যখন শহরের দোকানে পৌঁছায়, তখন দাম বেড়ে যায় কয়েক টাকা। অথচ এ বাড়তি দামের পুরোটা খামারির ঘরে পৌঁছায় না। বরং মাঝে মাঝে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ডিম বিক্রি করে লোকসান গুনতে হয় তাদের।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক দশকে দেশে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ শতাংশের বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদিত হয়েছিল এক হাজার ৪৯৩ কোটি পিস। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫০৯ কোটি পিসে।
অর্থাৎ, এখন প্রতিদিন দেশে ৬ কোটি পিসের বেশি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ আসে প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে। আর প্রতি ডিমে দুই টাকা করে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে গেলে, প্রতিদিন তাদের কাছে যায় প্রায় ১২ কোটি টাকা।
উৎপাদনের এ বড় অংশ জোগান দেয়া প্রান্তিক খামারিদের অবস্থাই অবশ্য সবচেয়ে নাজুক। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খামারির খরচ পড়ছে অন্তত ১০ টাকা ২৫ পয়সা। এখন ডিমের দাম সর্বোচ্চ হওয়ায় তারা কিছুটা লাভ পেলেও অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে বর্তমানে মাথাপিছু বছরে ১৪০টির বেশি ডিমের সরবরাহ রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মানদন্ড অনুযায়ী একজন সুস্থ মানুষের বছরে অন্তত ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু ডিমের উৎপাদন ২০০টিতে নেয়ার লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের।
বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়। এদিকে গরুর মাংসের দাম আগের মতোই আছে। ৮০০ টাকা কেজি বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে মাছের বাজারেরও একই চিত্র। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০, পাঙাশ ২২০ থেকে ২৩০, রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ এবং চিংড়ি এক হাজার থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা কেজি। পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০, বড় আকারের রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ ও ট্যাংরা ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চাষের শিং মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে। মাঝারি আকারের রুই কেনা যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে। এছাড়া, রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে গেলে হাজারের বেশি টাকা গুনতে হবে। তবে মাছের সাইজ এবং মাছ জীবিত বা মৃত হওয়ার উপরও দাম নির্ভর করে। প্রতিটি বাজারে ১০ থেকে ২০ টাকা কেজিপ্রতি কম বেশি হতে পারে।
আটা ও ময়দাও বিক্রি হচ্ছে আগের মতো বাড়তি দামে। প্রতি কেজি আটার দাম ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ময়দার দাম কোম্পানিভেদে ৭০ থেকে ৮০ টাকার উপরে গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের, যা দুই-তিন সপ্তাহ আগে কেজি প্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা কম ছিল।
সম্পাদক ও প্রকাশক:
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া
সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ
অফিস: সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। ফোন: ০২৩৩৪৪০৭৩৮১, মোবাইল: ০১৭১৫-৬৮১১৪৮, সম্পাদক, সরাসরি: ০১৭১২-২১৬২০২, Email: laksambarta@live.com, s.bhouian@live.com