
একসময় পায়ে ফুটবল খেলার জুতা ছিল না, পেট ভরে খাবার জুটত না। ছেঁড়া মোজা, পুরোনো কাপড় কিংবা ন্যাকড়া দিয়ে বানানো বলেই চলত ফুটবল খেলা। আইভরিকোস্টের আবিদজানের দরিদ্র এক মহল্লায় এভাবেই বেড়ে উঠেছিলেন ইয়ান দিওমান্দে। অথচ সেই ছেলেই এখন ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে মাঠ মাতাচ্ছেন।
দিওমান্দের এই উত্থান যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। দারিদ্র্য, সংগ্রাম আর সীমাহীন স্বপ্নকে সঙ্গী করে এগিয়ে যাওয়া এই তরুণ ফুটবলার এখন নিজ দেশের লাখো মানুষের অনুপ্রেরণা।
আইভরিকোস্টের আবিদজানের ইয়োপুগন এলাকার সিকোজি মহল্লায় শৈশব কেটেছে দিওমান্দের। সেখানে ফুটবল খেলার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তো দূরের কথা, অনেক পরিবারের কাছে তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থাই ছিল কঠিন। জুতা ছাড়াই রাস্তায় ফুটবল খেলতেন শিশুরা। কখনো ন্যাকড়ায় তৈরি বল, কখনো প্লাস্টিকের বল ছিল তাঁদের একমাত্র সম্বল।
দিওমান্দের বাবা কাজের সন্ধানে ফ্রান্সে চলে যাওয়ায় মা ও বোন রোকসানের সঙ্গেই বেড়ে ওঠেন তিনি। অভাবের সংসারে ফুটবলই হয়ে উঠেছিল তাঁর আনন্দের সবচেয়ে বড় উৎস। ছোটবেলা থেকেই বল পায়ে অসাধারণ দক্ষতা দেখাতেন। ড্রিবলিং ও শক্তিশালী শটের কারণে মহল্লার মানুষ তাঁকে ডাকত ব্রাজিলের সাবেক তারকা রবার্তো কার্লোসের নামে।
দিওমান্দের প্রতিভা একসময় নজরে আসে ব্যবসায়ী ও ফুটবল প্রতিভা অন্বেষক দেজ বাম্বার। তাঁর উদ্যোগে ২০১৪ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে আবিদজান থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে আসুবায় এএফআই সুদ কোমোয়ে একাডেমিতে যোগ দেন দিওমান্দে।
সেখানে তাঁর জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। নিয়মিত খাবার, পড়াশোনা ও ফুটবল প্রশিক্ষণের সুযোগ পান তিনি। এর আগে যাঁদের অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় খাবারই ছিল অনিশ্চিত, সেই শিশুদের জন্য একাডেমির জীবন ছিল নতুন পৃথিবীর মতো।
একাডেমির স্প্যানিশ কোচ হোসে হুলিয়ান লোপেস প্রথম দেখাতেই দিওমান্দের প্রতিভা বুঝতে পেরেছিলেন। বল পায়ে তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বয়সে বড় খেলোয়াড়দের বিপক্ষেও নির্ভয়ে খেলতেন তিনি।
প্রতিভার কারণে অনূর্ধ্ব-১২ দল থেকে সরাসরি অনূর্ধ্ব-১৪ দলে উন্নীত করা হয় তাঁকে। তবে শুরুতে একটি সমস্যা ছিল—বল পেলে পাস দেওয়ার চেয়ে একাই প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের কাটিয়ে এগিয়ে যেতে বেশি পছন্দ করতেন। কোচদের কাছ থেকে ধীরে ধীরে শিখেছেন কখন বল নিয়ে এগোতে হবে, কখন সতীর্থকে পাস দিতে হবে।
ফুটবলের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও ভালো ছিলেন দিওমান্দে। একাডেমিতে তাঁর মতো প্রতিভাবান অনেক শিশুই আগে নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ পায়নি। সেখানে ফুটবল প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষার ব্যবস্থাও ছিল।
কৈশোরেই ইউরোপের ফুটবলে খেলার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বয়সসংক্রান্ত নিয়ম তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ১৮ বছরের আগে ইউরোপের ক্লাবে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ফিফার বিধিনিষেধ থাকায় তাঁকে বিকল্প পথ খুঁজতে হয়। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যান তিনি।
তবে প্রতিভা আর পরিশ্রমের জোরে শেষ পর্যন্ত ইউরোপের ফুটবলে নিজের জায়গা তৈরি করেন এই আইভরিয়ান তরুণ। সর্বশেষ দলবদলে জার্মান ক্লাব লাইপজিগ থেকে ১২ কোটি ৫০ লাখ ইউরোর বিনিময়ে তাঁকে দলে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। এই অঙ্ক তাঁকে আফ্রিকার ইতিহাসে সবচেয়ে দামি ফুটবলার হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিয়ালের হয়ে শুরুতে কিছুটা সময় নিলেও পরে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে শুরু করেন দিওমান্দে। ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে গোল করে দলের জয়ে অবদান রাখেন। সেভিয়ার বিপক্ষে করেন একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট। চ্যাম্পিয়নস লিগে সাবেক ক্লাব লাইপজিগের বিপক্ষেও গোল করার পাশাপাশি সতীর্থের গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন।
মৌসুমের শুরুতে তাঁর পারফরম্যান্স রিয়াল সমর্থকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। একসময় যে ছেলেটি ফুটবল খেলার জন্য উপযুক্ত জুতা পেতেন না, এখন সেই ছেলেই বিশ্ব ফুটবলের বড় তারকাদের সঙ্গে একই দলে খেলছেন।
দিওমান্দের সাফল্যে আনন্দে ভাসছে তাঁর জন্মভূমি আইভরিকোস্ট। দেশটির ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি এখন নতুন আশার নাম। তাঁর উত্থানকে অনেকে দিদিয়ের দ্রগবা ও ইয়াইয়া তোরের মতো কিংবদন্তি ফুটবলারদের পথচলার সঙ্গে তুলনা করছেন।
তাঁর সাফল্যের গল্প তরুণদের মনে নতুন স্বপ্ন তৈরি করছে। দারিদ্র্য কিংবা সুযোগের অভাব যে প্রতিভা ও পরিশ্রমের পথে চূড়ান্ত বাধা হতে পারে না, দিওমান্দে যেন তারই উদাহরণ।
তবে খ্যাতি অর্জনের পরও নিজের শিকড় ভুলে যাননি এই ফুটবলার। পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো মহল্লার মানুষের জন্যও অর্থ পাঠান তিনি। যে পরিবেশে তাঁর ফুটবলের হাতেখড়ি, সেই মানুষগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছেন আজও।
দিওমান্দের জীবনে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর বোন রোকসান। তাঁর উৎসাহেই একসময় আফ্রিকার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এই তরুণ। সেই প্রিয় বোন এখন আর বেঁচে নেই। কিন্তু তাঁর দেওয়া প্রেরণা দিওমান্দের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
দিওমান্দের গল্পের সবচেয়ে আবেগঘন দিকটি লুকিয়ে আছে তাঁর শৈশবের বাস্তবতায়। যে একাডেমিতে তিনি বেড়ে উঠেছেন, সেখানকার শিশুদের একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সেখানে থাকার সবচেয়ে বড় আনন্দ কী। তাদের উত্তর ছিল—প্রতিদিন খেতে পারা।
সেই বাস্তবতা থেকে উঠে এসে আজ রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছেন দিওমান্দে। তাঁর এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বপ্ন পূরণেরও এক অনন্য উদাহরণ।
পায়ে জুতা না থাকা, খাবারের অনিশ্চয়তা কিংবা সুযোগের সীমাবদ্ধতা—কোনোটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। রাস্তার ফুটবল থেকে ইউরোপের বড় মঞ্চে পৌঁছে ইয়ান দিওমান্দে প্রমাণ করেছেন, প্রতিভার সঙ্গে পরিশ্রম ও অধ্যবসায় যুক্ত হলে অসম্ভব মনে হওয়া পথও একসময় পাড়ি দেওয়া যায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক:
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া
সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ
অফিস: সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। ফোন: ০২৩৩৪৪০৭৩৮১, মোবাইল: ০১৭১৫-৬৮১১৪৮, সম্পাদক, সরাসরি: ০১৭১২-২১৬২০২, Email: laksambarta@live.com, s.bhouian@live.com