ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ব্যর্থ, নাজুক যুদ্ধবিরতি টিকে থাকার আশায় মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নিরসনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রোববার অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হয়নি, ফলে নাজুক যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে—এমন আশায় রয়েছে পুরো অঞ্চল।

আলোচনা শেষে পাকিস্তান ত্যাগকালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, ওয়াশিংটন তেহরানের কাছে একটি ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ দিয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা একটি সহজ প্রস্তাব রেখে যাচ্ছি, এখন ইরান তা গ্রহণ করে কি না সেটাই দেখার বিষয়।”

অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ দাবি করেন, তাদের পক্ষ থেকে ‘গঠনমূলক প্রস্তাব’ দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্র এই দফায় আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল এবং তেল-গ্যাস স্থাপনাগুলো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

তবে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির কথাও জানা গেছে। সৌদি আরব তাদের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন পুনরায় চালু করেছে। একইসঙ্গে কাতার উপসাগরীয় নৌ-চলাচলে আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

আলোচনার আয়োজক পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা সংলাপ অব্যাহত রাখতে সহায়তা করবে এবং উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, “যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।”

বিরোধের প্রধান ইস্যু

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, মতবিরোধের মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানের দাবি এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগে তাদের অনীহা।

ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হওয়া হতাশাজনক হলেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানালে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালী—যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়—এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার মধ্যেই দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে যুদ্ধে জয়লাভ করেছে। তিনি বলেন, “চুক্তি হোক বা না হোক, আমরা জিতেছি।”

অবিশ্বাস ও চাপের রাজনীতি

ইসলামাবাদে প্রায় ২১ ঘণ্টার বৈঠকজুড়ে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, পূর্ববর্তী হামলা এবং পারস্পরিক সন্দেহ আলোচনাকে জটিল করে তোলে।

ইরানের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করা এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের অভিযান বন্ধের মতো শর্ত তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

যুদ্ধ চলাকালে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইরান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে এবং তেলের দাম বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত চাপ বাড়ায়।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা প্রণালীতে মাইন অপসারণে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। তবে ইরান এ দাবি অস্বীকার করে সতর্ক করেছে, এ ধরনের পদক্ষেপের জবাব দেওয়া হবে।

লেবানন ইস্যুতে জটিলতা

লেবাননকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইসরাইল জানিয়েছে, সেখানে যুদ্ধবিরতি প্রযোজ্য নয় এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

লেবাননের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক হামলায় দক্ষিণাঞ্চলে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, এবং সংঘাত শুরুর পর থেকে মৃতের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে।

আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তির আশা প্রকাশ করলেও হিজবুল্লাহ ইস্যুতে অবস্থান এখনো কঠোর রয়েছে।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *