কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপি-জামায়াত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা


তাজুল ইসলাম\ বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে কাল ১২ই ফেব্রæয়ারি। এ নির্বাচনে কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকেট-লালমাই) আসনে শেষ মুহুর্তে বদলে গেছে ভোটের সমীকরন।
নাঙ্গলকোট ও লালমাই উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-১০ সংসদীয় আসন। বিএনপির আধিক্য হিসেবে পরিচিত আসনটিতে বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী হাড্ডাহাড্ডি অবস্থানে। নির্বাচনে এই আসনে চমক দেখাতে পারে জামায়াত।
এ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপি’র নির্বাহী সদস্য মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, ঢাকা মহানগর (উত্তর) সহকারি সেক্রেটারি, জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় মজলিসে সুরা সদস্য মাওলানা মোহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত। এছাড়াও এ আসনে আরো পাঁচজন প্রার্থী রয়েছেন।
এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার সাথে ২০০৬ সাল থেকে উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দ্ব›েদ্ব জড়ান তারই অনুসারী মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া। ২০০৮ সালে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া এ আসনে মনোনয়ন পান। নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েন আব্দুল গফুর ভূঁইয়া। তৎসময়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর কারণে আওয়ামী লীগের লোটাস কামালের সাথে পরাজিত হন মোবাশ্বের আলম। পরবর্তীতে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন এবং নাঙ্গলকোটে তার রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গত ৩রা নভেম্বর আবদুল গফুর ভূঁইয়াকে প্রাথমিকভাবে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন দিলে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার অনুসারীরা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে চূড়ান্ত মনোনয়নের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত দলীয় মনোনয়ন পান আব্দুল গফুর ভূঁইয়া। ৩রা জানুয়ারি যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর প্রার্থিতা বৈধতাও পায়। পরে আবদুল গফুর ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে হলফনামায় তার দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি গোপনের অভিযোগে ইসিতে আপিল করেন একই আসনে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের প্রার্থী কাজি নুরে আলম ছিদ্দিকি। ১৮ই জানুয়ারি এ নিয়ে শুনানির পর আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরপর প্রার্থিতা ফিরে পেতে উচ্চ আদালতে রিট করেন গফুর ভূঁইয়া। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আবদুল গফুর ভূঁইয়ার করা রিটটি ২২শে জানুয়ারি সরাসরি খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্ট গফুর ভূঁইয়ার করা রিট খারিজ করে দেয়ায় মনোনয়নপত্র বাতিলে ইসির সিদ্ধান্তই বহাল থাকে।
এদিকে, মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও ঋণখেলাপি ও দলীয় প্রত্যয়নপত্র জমা না দেয়ায় ৩রা জানুয়ারি বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। এর বিরুদ্ধে তিনি ইসিতে আপিল করেন। শুনানি নিয়ে নির্বাচন কমিশন ১৮ই জানুয়ারি মোবাশ্বের আলমের আপিল নামঞ্জুর করে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এ সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রার্থিতা ফিরে পেতে ১৯শে জানুয়ারি তিনি হাইকোর্টে রিট করেন।
আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের দিনই মোবাশ্বের আলমকে বিএনপি মহাসচিবের সই করা দলীয় প্রত্যয়নপত্রে কুমিল্লা-১০ আসনের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। পরে ৬ই জানুয়ারি আদালত তার মনোনয়ন বৈধ করে ও প্রতীক বরাদ্দে ইসিকে নির্দেশনা প্রদান করেন। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে নির্বাচনী মাঠ থেকে ছিটকে পড়েন আব্দুল গফুর ভূঁইয়া।
বিএনপির এ দুই নেতার নিজেদের মনোনয়ন নিয়ে এলাকায় আন্দোলন ও আদালতে দৌড়াদৌড়ি করে সিংহভাগ সময় কেটেছে। এর মধ্যে গ্রামে, পাড়া-মহল্লায় ভোটারদের নিকট পৌঁছেছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত। ভোটারদের নিকট তুলে ধরেছেন নিজের কর্মসূচি ও প্রতিশ্রæতি।
শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন নিয়ে মাঠে নামলেও ঘর গোছাতেই সময় পার করতে হচ্ছে বিএনপির প্রার্থী মোবাশ্বের ভূঁইয়াকে। ইতিমধ্যে জেলা বিএনপির মধ্যস্থতায় গফুর-মোবেশ্বর দ্ব›েদ্বর অবসান হয়েছে। ৪ঠা ফেব্রæয়ারি থেকে নাঙ্গলকোটে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রচারণায় যুক্ত হয়েছেন আব্দুল গফুর ভূঁইয়া।
এ সময় তারা উভয়েই নিজেদের বিরোধ মিটিয়ে ফেলেছেন বলে কর্মীদের জানান দেন। আব্দুল গফুর ভুঁইয়া বিভিন্ন সমাবেশে বলেন, নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা নিশ্চিত করে লাভ নেই। আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। ফলে বিএনপি নেতা-কর্মীরা আগের তুলনায় বেশ উজ্জীবিত।
নাঙ্গলকোট ও নবগঠিত লালমাই উপজেলা এখনো নানা কারণে পিছিয়ে। উপজেলা গঠনের কয়েক যুগ পেরিয়ে গেলেও নাঙ্গলকোটে এখনো স্থাপিত হয়নি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। নেই কোন লাইনের গ্যাস সংযোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়া-লেখার মান উন্নয়ন ঘটেনি। যাতায়াত ব্যবস্থা খুবই খারাপ। সড়ক অবকাঠামো নেই তেমন। রেল স্টেশনে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ট্রেন থামে না। ঢাকা-চট্টগ্রামে ট্রেন যাতায়াতের জন্য লাকসামে যেতে হয়। কিশোর গ্যাং ও মাদকের অভয়ারণ্য এই উপজেলা।
অন্যদিকে, নবগঠিত লালমাই উপজেলার অনেক কিছুই এখনো অগোছালো। সবই সাজাতে হবে নতুন সংসদ সদস্যকে।
নাঙ্গলকোটের স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, কত সরকার আইলো গেলো নাঙ্গলকোটের রাস্তা-ঘাট থেকে শুরু করে তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। কিছু কিছু ব্যক্তির উন্নয়ন হয়েছে। আমরা চাই এমন একজন এমপি নির্বাচিত হোক, যিনি নিজের উন্নয়নের কথা চিন্তা না করে নাঙ্গলকোটের সার্বিক উন্নয়ন করবে। জনগনের জন্য সরকার নির্ধারিত বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে পৌঁছে দেবে এবং মাদক ও সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করবে।
নাঙ্গলকোট ও লালমাই ২ উপজেলায় মোট ভোটার ৫ লাখ ২২ হাজার ২৮৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬৩ হাজার ৫৫৩ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৭৩৫ জন। পোস্টাল ভোটার ১৩ হাজার ৯৩৮ জন।
কুমিল্লা-১০ (লালমাই-নাঙ্গলকোট) আসনে ভোটকেন্দ্র ১৫২টি। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত ১১৩টি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মোট প্রার্থী ৬ জন। প্রার্থীরা হলেন- বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাড়িপাল্লা প্রতীকের মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত, মুক্তিজোটের ছড়ি প্রতীকের কাজী নূরে আলম সিদ্দিকী, আম জনতা পার্টির প্রজাপতি প্রতীকের আব্দুল্লাহ আল নোমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের সামছুদ্দোহা, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের রমিজ বিন আরিফ এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের ডাব প্রতীকের হাসান আহমেদ।
ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, উন্নয়ন কর্মকান্ড, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা এই তিনটি বিষয়ই এবারের ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।
স্থানীরা জানান, এখানে মূল প্রতিদ্ব›িদ্বতা হবে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে। বিএনপির দলীয় নানাবিধ সমস্যার ফলে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক ও জনসমর্থনে তাদের কাছাকাছি অবস্থানে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও সাধারণ ভোটাররাই হবে এ আসনে জয় পরাজয় নির্ধারণের মূল ফ্যাক্টর।
