👁 263 Views

কৃষিতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগাতে হবে

            ড. মো. জামাল উদ্দিন\ দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব আজ জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই হারে তৈরি হচ্ছে না। এই বাস্তবতায় বেকারত্ব মোকাবেলায় নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত কৃষি-ব্যবসায় স্বনিযুক্তির প্রসার। এটি নতুন সরকারের জন্য হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর নীতি। কারণ, কৃষি এখনো দেশের বৃহত্তম কর্মসংস্থান খাত এবং সঠিক পরিকল্পনায় এটিকে উদ্যোক্তা-নির্ভর শিল্পে রূপ দেয়া সম্ভব। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৫-২৯ বছর বয়সী প্রায় ১৯.৪ লাখ যুবক বেকার, যা যুব শ্রমশক্তির প্রায় ৭%। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বেকারদের প্রায় ৭০% গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা। অন্যদিকে সামগ্রিক শ্রমবাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছর প্রায় ২০-২৫ লাখ নতুন কর্মী শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে না, ফলে যুব বেকারত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

            এমন পরিস্থিতিতে কৃষি খাতের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ, শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান সীমিত হলেও কৃষি এখনো প্রায় ৪০-৪৫% মানুষের কর্মসংস্থান দেয়, যদিও এর উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক কম। বাংলাদেশে কৃষিকে দীর্ঘদিন শুধু জীবিকা নির্বাহের পেশা হিসেবে দেখা হয়েছে, ব্যবসা হিসেবে নয়। ফলে তরুণরা কৃষি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ, আধুনিক কৃষি-ব্যবসা, যেমন উচ্চমূল্যের ফসল, প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড-চেইন, কৃষি প্রযুক্তি, ই-কমার্স বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। বর্তমানে কৃষিতে শ্রমিক সংকট দেখা যাচ্ছে। কারণ, তরুণরা শহরমুখী হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে কৃষিতে কাজের সুযোগ আছে, কিন্তু তা আকর্ষণীয় নয়। যদি কৃষিকে লাভজনক উদ্যোক্তা-ভিত্তিক খাতে রূপ দেয়া যায়, তাহলে একইসাথে বেকারত্ব কমবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

            নতুন সরকার পরিকল্পিতভাবে যে খাতগুলোতে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারে তা হলো: কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-এর মাধ্যমে উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য উৎপাদন (ফল, সবজি, মসলা, ফুল, অর্গানিক পণ্য, এসবের বাজার দ্রæত বাড়ছে। এগুলোতে কম জমিতে বেশি আয় সম্ভব); পশুপালন, ডেইরি, পোল্ট্রি, ছাগল, মাছ চাষ, গ্রামীণ স্বনিযুক্তির সবচেয়ে দ্রæত ফলদায়ক খাত; কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ (শুকনো খাবার, জুস, আচার, প্যাকেজিং: এগুলো গ্রামে ছোট শিল্প গড়ে তুলতে পারে); কৃষি প্রযুক্তি ও সার্ভিস (ড্রোন, স্মার্ট সেচ, মাটি পরীক্ষা, কৃষিযন্ত্র ভাড়া নতুন প্রজন্মের জন্য আকর্ষণীয় ব্যবসা হতে পারে); কৃষি ই-কমার্স (খামার থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি, যা মধ্যস্বত্বভোগী কমিয়ে কৃষকের আয় বাড়াবে)।

            এছাড়াও গ্রামীণ পর্যায়ে সমন্বিত কৃষি খামার পদ্ধতি (ওহঃবমৎধঃবফ ঋধৎসরহম ঝুংঃবস) বেকারত্ব দূরীকরণে অত্যন্ত কার্যকর একটি মডেল হতে পারে। এই পদ্ধতিতে ফসল, মাছ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, ফলবাগান ও জৈব সার উৎপাদন: সবকিছু একই খামারে পারস্পরিক নির্ভরশীলভাবে পরিচালিত হয়, ফলে সারা বছর কাজের সুযোগ তৈরি হয় এবং ঝুঁকি কমে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এর গবেষণায় দেখা গেছে, সমন্বিত খামারে একক ফসলভিত্তিক চাষের তুলনায় আয় ২-৩ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং অতিরিক্ত শ্রমের চাহিদা তৈরি হয়, যা স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে সহায়তা করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের গবেষণা বলছে, ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এই পদ্ধতি বিশেষভাবে উপযোগী। কারণ, এতে কম জমিতেই বহুমুখী উৎপাদন সম্ভব হয়। নতুন সরকার যদি ইউনিয়ন বা উপজেলাভিত্তিক সমন্বিত খামার ক্লাস্টার গড়ে তোলে, প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করে এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করে, তবে গ্রামেই হাজার হাজার স্বনিযুক্ত উদ্যোক্তা তৈরি হবে, যা শহরমুখী চাপ কমিয়ে টেকসই গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম।

            তবে সমস্যা হলো, কৃষি শিক্ষিতরাও এখনো উদ্যোক্তা তেমন হতে পারছে না। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্যোক্তা শিক্ষা প্রায় নেই। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যবসা পরিচালনার প্রশিক্ষণ পায় মাত্র ৫%। ফলে তারা চাকরির দিকে ঝুঁকে পড়ে। বেশিরভাগ চাকরি পায় না, তখন বেকারত্ব বাড়ে। এমন বাস্তবতায় করণীয় হতে পারে: জাতীয় কৃষি উদ্যোক্তা কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন (প্রতিটি জেলায় অমৎরনঁংরহবংং ওহপঁনধঃরড়হ ঈবহঃবৎ) স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে প্রশিক্ষণ, ঋণ, বাজার সংযোগ দেয়া হবে; সহজ ঋণ ও স্টার্টআপ ফান্ড (কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, ভর্তুকি ও ভেঞ্চার ফান্ড প্রয়োজন); জমি ও অবকাঠামো সহায়তা (যুবকদের জন্য লিজ ভিত্তিক জমি, কোল্ড স্টোরেজ, প্রসেসিং ইউনিট স্থাপন জরুরি); বাজার নিশ্চয়তা (সরকারি ক্রয়, রপ্তানি সহায়তা ও ডিজিটাল মার্কেটপ্লে­স চালু করতে হবে); শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সংস্কার (স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই কৃষি-উদ্যোক্তা শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন); নারীদের অংশগ্রহণ (গ্রামীণ নারীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি বেকারত্ব কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে)।

            বাংলাদেশে কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা কম হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। শিল্পায়ন সময়সাপেক্ষ, কিন্তু কৃষি-ব্যবসা দ্রæত ফল দিতে পারে। বিশেষ করে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এটি অপরিহার্য। যুব সমাজ যদি কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশ হয়, তাহলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় ঝুঁকি। তাই ‘চাকরি খোঁজা নয়, চাকরি সৃষ্টি’ এই দর্শনকে সামনে রেখে কৃষি-ব্যবসায় স্বনিযুক্তি প্রসার ঘটাতে হবে। বাংলাদেশে জমি, জলবায়ু, শ্রমশক্তি: সবই আছে; প্রয়োজন শুধু নীতিগত অগ্রাধিকার ও কার্যকর বাস্তবায়ন। নতুন সরকার যদি পরিকল্পিতভাবে কৃষি-উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেয়, তাহলে একদিকে বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম হবে।

লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, বারি, কুমিল্লা।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *