নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে মামলা রুজু বিশ্বের ৭৫ দেশের ভিসা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে ৭৫ কংগ্রেসম্যানের চিঠি



বিশেষ সংবাদদাতা\ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫টি দেশের নাগরিকের জন্য অভিবাসী ভিসা অনুমোদন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে মামলা রুজু করা হয়েছে। মামলায় বিবাদী করা হয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-কে। অভিবাসন অধিকারকর্মী, আইনজীবী ও মার্কিন নাগরিকদের একটি জোটের দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত অভিবাসন নীতিকে ভেঙ্গে দিয়েছে এবং তা জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক আচরণের শামিল।
পররাষ্ট্র দপ্তর সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, যেসব দেশের অভিবাসীরা ‘অগ্রহণযোগ্য হারে’ সরকারি কল্যাণ ভাতা গ্রহণ করে, সেসব দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে। ঘোষণায় আরো বলা হয় যে, নতুন অভিবাসীরা যেন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের ওপর আর্থিক বোঝা না হন, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই তা বহাল থাকবে। সোমালিয়া, হাইতি, ইরান, ইরিত্রিয়া ও কিউবাসহ বহু দেশ এই তালিকায় রয়েছে।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, কিউবা থেকেই একসময় রুবিওর বাবা-মা যুক্তরাষ্ট্রে অনথিভুক্তভাবে প্রবেশ করেছিলেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে দেয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়, প্রেসিডেন্টের নীতিনির্দেশ অনুযায়ী অভিবাসীদের আর্থিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে নীতিমালা, বিধি ও নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা চলছে। তবে মামলাকারীদের দাবি, ‘পাবলিক চার্জ’ সংক্রান্ত যুক্তি সম্পূর্ণ প্রমাণহীন এবং বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ অভিবাসী ভিসা আবেদনকারী শুরু থেকেই নগদ কল্যাণ ভাতা পাওয়ার যোগ্য নন এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা বছরের পর বছর এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন।
রুজুকৃত মামলায় আরও বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যত প্রায় অর্ধেক অভিবাসী ভিসা আবেদন বন্ধ করে দিয়েছে এবং তা ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের স্পষ্ট বিধানের পরিপন্থী। আইনে যেখানে প্রতিটি আবেদন ব্যক্তিভিত্তিক মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে, সেখানে জাতীয়তার ভিত্তিতে সামগ্রিকভাবে ভিসা স্থগিত করা কংগ্রেসের নির্ধারিত কাঠামো লঙ্ঘন করে।
এই সিদ্ধান্তের সময়সীমার সঙ্গে মিনেসোটায় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) সদস্য মোতায়েনের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, সেখানে কল্যাণ ভাতা জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। তবে বাদীপক্ষের বক্তব্য, এমন অভিযোগের অজুহাতে নির্দিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের ভিসা প্রক্রিয়া বন্ধ করা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। কলম্বিয়ার এক চিকিৎসকের উচ্চমানের চাকরিভিত্তিক ভিসা অনুমোদিত হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে তা স্থগিত হয়ে গেছে। আবার নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডের এক মার্কিন নাগরিক স্ত্রীকে নিয়ে গুয়াতেমালায় ভিসা সাক্ষাৎকারে গেলে জানতে পারেন, স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে দেয়া হবে না। উপরন্তু, চিকিৎসা সংক্রান্ত জটিলতায় ভোগা তাদের ছোট সন্তানও সেখানে আটকে রয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, এই নীতি সংবিধানবিরোধী, ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে প্রণীত এবং পরিবার পুনর্মিলনসহ মৌলিক অভিবাসন অধিকার ক্ষুন্ন করছে। অন্যদিকে, সরকার বলছেন, এটি সাময়িক ব্যবস্থা এবং পর্যালোচনা শেষ হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে, বহাল থাকবে নাকি বাতিল হবে এই ভিসা স্থগিতাদেশ।
অপরদিকে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ উল্লেখিত ৭৫টি দেশের ওপর অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশ তুলে নিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিয়ো ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী ক্রিস্টি নয়েমকে চিঠি দিয়েছেন ৭৫ জন কংগ্রেসম্যান।
উল্লেখিত চিঠিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ওই সিদ্ধান্তের ফলে গোটা বিশ্বের ভুক্তভোগীদের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে এশিয়ান প্যাসিফিক আমেরিকান ককাসের চেয়ার কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেংসহ ৭৫ কংগ্রেসম্যান ভিসা কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ উঠিয়ে নেয়ার আহŸান জানান।
চিঠিতে বলা হয়, স্থগিতাদেশের কারণে ভিসাধারী ১ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি এশিয়ান-আমেরিকান পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে পারছেন না। উপরন্তু বিশ্বের ‘৪০ শতাংশ’ মানুষ এই ভিসা স্থগিতাদেশের আওতায় পড়েছেন। এটি বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করার শামিল। চিঠিতে আরও বলা হয় যে, বিদ্যমান রীতি মেনে যারা পারিবারিক, ব্যবসায়িক, বিনিয়োগ, চাকরি সূত্রে যুক্তরাষ্ট্রে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন, তাদের বলা হচ্ছে যে ‘সঠিক উপায়ে আসতে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগেই আগ্রহীদের সঙ্গে এমন আচরণের ব্যাপারটি মেনে নেয়া যায় না। “এটা নির্দয় আচরণের শামিল। কারণ অভিবাসীরা যাবতীয় রীতি মেনেই সবকিছু সাবমিট করেছেন ভিসার জন্যে। অথচ, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আইনি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে আগ্রহীদেরকে বাধা দেয়া হচ্ছে।”
উল্লেখ্য, গত ২১শে জানুয়ারি বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসা দেয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া, অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, রাশিয়া, ইরান, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, কুয়েত, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক।
মার্কিন পররাষ্ট মন্ত্রণালয় এ বিষয়ক এক এক্স পোস্টে বলেছিল, যেসব দেশের অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণভাতা অগ্রহণযোগ্য হারে নিয়ে থাকে, এমন ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসার প্রক্রিয়া পররাষ্ট্র দপ্তর স্থগিত রাখবে। নতুন অভিবাসীরা মার্কিন জনগণের সম্পদে ভাগ বসাবে না- যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র এটা নিশ্চিত হতে পারছে ততদিন স্থগিতের এ আদেশ কার্যকর থাকবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কনস্যুলার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়, ‘পাবলিক চার্জ’ নিয়মের অধীনে তারা ভিসার আবেদন বাতিল করতে পারবেন। ‘পাবলিক চার্জ’ নিয়মে সাধারণত দেখা হয়, কোনো ভিসা আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে নিজের খরচে জীবনযাপন করতে পারবেন কিনা!
মার্কিন প্রশাসন যদি মনে করে, আবেদনকারী ব্যক্তি সরকারি কল্যাণভাতা বা অন্যান্য সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে তার ভিসা প্রত্যাখ্যান করবে।
এ ব্যাপারে গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে সব মার্কিন দূতাবাসকে ‘পাবলিক চার্জ’ বিধানটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করার নির্দেশ দেয়া হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের বিষয়ে খরগহস্ত হয়েছেন। একের পর এক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে ব্যাপক আকারে ভিসা দেয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
Ref: thikananews
