সোমবার, ১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

অনলাইনে জুয়ার ফাঁদে নিঃস্ব হাজারো মানুষ!

অনলাইনে জুয়ার ফাঁদে নিঃস্ব হাজারো মানুষ!
১২৫ Views

            ষ্টাফ রিপোর্টার\ তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে যোগাযোগ-কেনাকাটা-লেনদেনসহ অনেক কিছুই হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। গতিশীল করে তুলেছেন অনেকের জীবনকে। তবে এর কিছু বিপরীত দিকও আছে।

            মূলত: তথ্যপ্রযুক্তির কতেক অপব্যবহার- কিছু মানুষের জীবনে ফেলেছে অনেক সর্বনাশের গাঢ় ছায়া। সেই সর্বনাশের অন্যতম একটি দিক হলো অনলাইন জুয়া। কেউ কেউ এখনো এটিকে বলে থাকেন সেই ‘ক্যাসিনো’ খেলা!

            মূলত এবং আইনত: বাংলাদেশে জুয়া নিষিদ্ধ; তবুও তা এখনো চলছেই। বিশেষ করে অনলাইনে এ ধরনের জুয়াখেলা ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে এবং গ্রামে-গঞ্জেও। চোখে ধুলো নিক্ষেপের মতো প্রতারণার এই ফাঁদে হাজারো মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে! একবার এই ফাঁদে পা রাখলে প্রলোভনের জাল ছিড়ে বের হয়ে আসা খুবই কঠিন। কোটি টাকা পাবার আশা-নেশায় অনেকে আবারও খেলছেন এবং তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতির মাত্রা ভয়ানক!

            আসলে অনলাইনে জুয়া চলে সহজলভ্য অ্যাপসের মাধ্যমে। যে কেউ চাইলেই তার স্মার্ট ফোনে অ্যাপ আপ করে কিংবা ব্রাউজারে লিংক ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খুলে এই জুয়ার আসরে ঘরে বসেই যোগ দিতে পারে। এতে লেনদেন হয় মোবাইল ব্যাংকিং অর্থাৎ বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে।

            সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন বা এজেন্টদের পোস্টের মাধ্যমে অনলাইনে জুয়ার ফাঁদ পাতা হয়। লোভের ফাঁদে ফেলতে সোশাল মিডিয়ায় ডেমো অ্যাকাউন্টে কয়েকগুণ বেশি লাভ দেখিয়ে ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া হয়। লোভ দেখানো হয় লাখপতি হওয়ার! অ্যাপসগুলোতে এমনভাবে সফটওয়ার সাজানো থাকে, যাতে শুরুতে হয়তো সামান্য লাভ পাওয়া যায়। পরে আরো লাভের আশায় যখন কেউ আরও টাকা বিনিয়োগ করে তখনই শুরু হয় লুটে নেয়া। হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় আরো খেলতে গিয়ে মানুষ আরো বিপদে পড়ে। একসময় সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় এবং অনেকেই অলরেডি সর্বস্ব হারিয়ে এখন সর্বস্বান্ত!

            তাছাড়া, অনেকেই কৌতূহল থেকেও  এই ধরনের জুয়া খেলা শুরু করার পর এতে এমনভাবে জড়িয়ে যাচ্ছেন যে, কেউ কেউ আর এ নেশা থেকে বের হতে পারেন না। প্রথমে লাভবান হয়ে পরবর্তী সময়ে লোভে পড়ে একপর্যায়ে খোয়াচ্ছেন লাখ লাখ টাকা বা কোটি টাকাও। এ ধরনের জুয়ার কারণে বাড়ছে পারিবারিক বিরাট অশান্তি, মানসিক বিষন্নতা, দাম্পত্য জীবনে কলহ। খেলার টাকা জোগাড় করতে বাড়ছে অপরাধ। বাড়ছে নৈতিক অবক্ষয়। এই সর্বনাশা অনলাইন জুয়ার নেশায় বিপন্ন পরিবার, সমাজ- হয়তো কোনো কোনো রাষ্ট্রও!      বিশেষ করে এমন অনলাইন জুয়ায় আসক্ত বেশির ভাগই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ তরুণ প্রজন্মরাই। অবশ্য কতেক বয়স্কদেরও এখন এই খেলা খেলতে দেখা যায়। এমনকি গ্রাম এলাকার অনেক শ্রমজীবীমানুষ তাদের মজুরিটুকুও এই পথে নষ্ট করছেন। লোভে পড়ে লাভের আশায় অনেকে ধারকর্জ করছেন, নিজের শেষ সম্বল জমিটুকুও বিক্রি করে দিচ্ছেন। কেউ কেউ বেদিশা হয়ে বাপদাদার জায়গা-জিগিরও বিক্রি করে দিচ্ছেন এবং পরে সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন বা কেউ কেউ সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছেন।

            বলাবাহুল্য, অনলাইন জুয়ার এহেন আসক্তি মাদকের আসক্তির চেয়েও প্রবল ও ক্ষতিকর। অনলাইনে জুয়া দেশের জন্যও হয়ে ওঠেছে মারাত্মক অশনিসংকেত। কারণ এইসব সাইটের সফটওয়্যারসহ মূল মালিকানা থাকে বিদেশিদের হাতে। বিশেষ করে চীন, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে অনলাইনে জুয়ার সাইটগুলো পরিচালিত হয়। দেশে কিছু এজেন্ট তাদের সহায়তা করে থাকে। অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে অধিকাংশরাই নিঃস্ব হয়ে যায়। তবে এসব সাইট পরিচালনার মূলহোতা ছাড়াও লাভবান হচ্ছে দেশ থেকে যুক্ত থাকা এজেন্টরা। মূলত: জুয়া খেলায় দক্ষ হয়ে উঠা ও এসব প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া ব্যাক্তিরা সাইটগুলোতে ১ থেকে ১০ লাখ টাকা ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এজেন্ট একাউন্ট নেয়। এরপর অবৈধ কারেন্সি বিভিন্ন অংকে বিক্রি করাসহ জুয়া বিস্তারে তারাই ভূমিকা রাখছে বেশি।

            এসব এজেন্টের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে রিচার্জ করা টাকা অবৈধভাবে চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। যার ফলে বেড়ে যাচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি। অনলাইন জুয়ায় বিদেশে পাচার হচ্ছে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ। এই অনলাইন জুয়ার আগ্রাসন রুখতে না পারলে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে দেশব্যাপী এবং অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ জীবনেও।

            তবে, এ ব্যাপারে সরকার এরই মধ্যে তৎপর হয়েছেন। বিটিআরসির রিপোর্ট অনুযায়ী, সম্প্রতি ৩৩১টি জুয়ার সাইট দেশের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই বন্ধ করাটাও অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর থাকছে না। কারণ প্রতারক চক্র প্রতিটি অ্যাপস বা সাইটে বিকল্প কয়েকটি আইপি ব্যবহার করে থাকে। একটা বন্ধ হলে আরেকটা আইপি দিয়ে বা নাম পরিবর্তন করে তারা নতুনভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই এ বিষয়ে দরকার, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান এবং কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। অবশ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তারা অনলাইনের জুয়ার বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করেছেন! কিন্ত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের পর খুব দ্রæতই তারা জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এরপর তারা আবার গড়ে তুলে জুয়ার সাইট। তারা বের হয়ে আবার বিভিন্ন সাইটের মাধ্যমে সক্রিয় হয়েছে। কেউ নাম বদলে আবার সাইট চালু করেছে।

            এ ব্যাপারে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) এর ধারাবাহিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৮ মামলায় ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তাদের প্রায় সবাই এখন জামিনে ছাড়াও পেয়ে গেছেন।

            এদিকে, সাইবার পুলিশ সেন্টারে ৩ জুয়ার সাইটের বিরুদ্ধে পৃথক ৪টি মামলার তদন্ত চলছে। ওয়ানএক্সবেট এর দুই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৬ জনকে। তারা এই সাইটের এজেন্ট, হুন্ডিসহ বিভিন্ন স্তরে কাজ করতেন। একইভাবে মোস্টবেট এর ৮ জন, বেটবাজ ৩৬৫- এর ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিবির-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ এখন পর্যন্ত একটি মামলা নিস্পত্তি করেছেন। শিলং তীর নামে ওই অনলাইন জুয়ার সাইটের সাথে জড়িত ৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া আরও ৩টি মামলায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

            আসলে অনলাইন জুয়া বন্ধে সবচেয়ে বেশি যেটা দরকার.. সেটা হলো জনসচেতনতা। সামাজিকভাবে এ ধরণের অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে, জুয়ার ক্ষতিকর নানাদিকগুলোও। কিভাবে এটি মানুষকে নিঃস্ব করে দেয়, তা তুলে ধরতে হবে। ঘরে ঘরে ব্যাপক সচেতনতা আর সরকারের কঠোর তৎপরতার ফলেই নির্মুল করা সম্ভব হতে পারে অনলাইন জুয়ার সর্বগ্রাসী আগ্রাসন।

            এ বিষয়ে সাইবার বিশেষজ্ঞ ও ডিকোডস ল্যাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, প্রযুক্তির এ যুগে আপনি চাইলেই এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। ব্যক্তিপর্যায়ে জনসচেতনতা তৈরি ছাড়া এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। কারণ, এসব জায়গায় বিনিয়োগ করা খুবই সহজ। শুরুতে অল্প টাকা দিতে হচ্ছে। যেমন- আপনি ২০ থেকে ১০০ টাকা দিয়ে অনলাইনে জুয়া খেলা শুরু করতে পারেন। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এগুলো মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে! গ্রামাঞ্চলের একেবারে নিম্নপর্যায়ের ব্যক্তিরাও এতে জড়িয়ে পড়ছেন, যা খুবই ভয়াবহ।

            তিনি আরো বলেন যে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি পাঠ্যক্রমেও এসব বিষয়ের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে হবে। অনলাইন জুয়ার এহেন সর্বগ্রাসী আগ্রাসন- কিভাবে এটি মানুষকে নিঃস্ব করে দেয়, তা তুলে ধরতে হবে। এটি হতে হবে ঘরে ঘরে ব্যাপক সচেতনতা আর সরকারের কঠোর তৎপরতার মাধ্যমেই। Courtesy: dainikamadershomoy

Share This