
মৃত এক নারীর দান করা জরায়ু অন্য এক জরায়ুবিহীন নারীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে—আর সেই জরায়ুতেই বেড়ে উঠে জন্ম নিয়েছে এক সুস্থ শিশু। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, যুক্তরাজ্য–এর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো।
প্রকৃতির নিয়মে সন্তান বেড়ে ওঠে মায়ের জরায়ুতে। কিন্তু ত্রিশোর্ধ্ব গ্রেস বেল জন্মগতভাবেই জরায়ুহীন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি জানতে পারেন, নিজের গর্ভে সন্তান ধারণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবুও মা হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি।
মা হওয়ার দুটি পথ
গ্রেস ও তাঁর জীবনসঙ্গীর সামনে ছিল দুটি পথ—সারোগেসি (অন্য নারীর গর্ভে ভ্রূণ স্থাপন) অথবা জরায়ু প্রতিস্থাপন। দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন গ্রেস। কারণ, এতে সন্তান তাঁর নিজের শরীরেই বেড়ে উঠবে, তাঁর রক্ত থেকেই পুষ্টি ও অক্সিজেন পাবে।
২০২৪ সালের জুনে The Churchill Hospital–এ টানা ১০ ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মৃত এক নারীর দান করা জরায়ু গ্রেসের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। কয়েক মাস পর ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) পদ্ধতিতে তাঁর ডিম্বাণু ও স্বামীর শুক্রাণু থেকে ভ্রূণ তৈরি করা হয় এবং তা প্রতিস্থাপিত জরায়ুতে স্থাপন করা হয় Lister Fertility Clinic–এ।
এরপর শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়—গ্রেসের শরীরেই বেড়ে উঠতে থাকে সেই ভ্রূণ।
ইতিহাসের সাক্ষী এক জন্ম
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পশ্চিম লন্ডনের Queen Charlotte’s and Chelsea Hospital–এ জন্ম নেয় শিশুটি। জন্মের সময় তার ওজন ছিল প্রায় সাত পাউন্ড। নাম রাখা হয়েছে হিউগো।
যুক্তরাজ্যে একটি ক্লিনিক্যাল গবেষণার অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত ১০ জন নারীর দেহে মৃত দাতার জরায়ু সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে গ্রেসই প্রথম, যিনি এভাবে সন্তান জন্ম দিলেন।
অঙ্গ প্রতিস্থাপন নিজেই অত্যন্ত জটিল চিকিৎসা প্রক্রিয়া। তার ওপর সেই প্রতিস্থাপিত অঙ্গে একটি ভ্রূণের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা—চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অনন্য সাফল্য।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে একই হাসপাতালে জন্ম নেয় আরেক শিশু এমি, যার মাকে জরায়ু দান করেছিলেন তাঁর জীবিত বড় বোন। তবে মৃত দাতার জরায়ুতে বেড়ে ওঠা হিউগোর গল্প আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত শতাধিক জরায়ু প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০–এর বেশি সুস্থ শিশুর জন্ম হয়েছে প্রতিস্থাপিত জরায়ুতে।
সামনে কী?
গ্রেস চাইলে ভবিষ্যতে আরেকবার সন্তান ধারণের চেষ্টা করতে পারবেন। তবে নির্দিষ্ট সময় পর প্রতিস্থাপিত জরায়ুটি অপসারণ করা হবে। কারণ, অঙ্গটি সুস্থ রাখতে তাঁকে শক্তিশালী ওষুধ সেবন করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়াতেই নেওয়া হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত।
মৃত এক নারীর দান, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আর অদম্য মাতৃত্বের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে হিউগোর পৃথিবীতে আসার গল্প হয়ে থাকল মানবতার এক অনন্য উদাহরণ।