ফুটবল ম্যাচের তর্কে মৃত্যু, দুই মেয়েকে এতিম করে গেলেন শরিফুল

কাজের সন্ধানে মাত্র আট মাস আগে নীলফামারী থেকে কুমিল্লায় এসেছিলেন মো. শরিফুল ইসলাম (৩৮)। স্বপ্ন ছিল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে দুই মেয়ের মুখে হাসি ফোটাবেন, নতুন শহরে তাদের স্কুলে ভর্তি করাবেন। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ ঘিরে সামান্য কথাকাটাকাটি সেই স্বপ্নকে মুহূর্তেই ধুলিস্যাৎ করে দিল।

মঙ্গলবার গভীর রাতে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধনপুর এলাকায় একটি চায়ের দোকানে আর্জেন্টিনা ও মিসরের ম্যাচ দেখছিলেন স্থানীয়রা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, খেলার শুরুতেই মেসির পেনাল্টি মিস করার পর শরিফুল পাশের এক আর্জেন্টিনা সমর্থককে উদ্দেশ করে হাস্যরসের ছলে মন্তব্য করেন। সেই কথাই দ্রুত তর্কে, পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়।

অভিযোগ, কয়েকজন তরুণ মিলে শরিফুলকে প্রথমে চায়ের দোকানে মারধর করেন। প্রাণ বাঁচাতে তিনি পাশের একটি মেসে আশ্রয় নিলেও হামলাকারীরা সেখানে গিয়েও তাঁকে ছাড়েননি। নির্মম মারধরের একপর্যায়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত শরিফুল নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার উত্তর চেরাংগা গ্রামের বাসিন্দা। স্ত্রী বিউটি বানু ও দুই কন্যাকে নিয়ে কুমিল্লা নগরের মঠপুষ্করনী এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। প্রতিদিন অটোরিকশা চালিয়ে মালিকের জমা পরিশোধের পর যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত চার সদস্যের সংসার।

স্বামীর মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছেন বিউটি বানু। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “খেলা নিয়া মানুষটারে এইভাবে মাইরা ফালাইবো, এইটা কেমন কথা? আমার দুইডা মাইয়া এহন কারে বাবা কইয়া ডাকবো? যারা আমার স্বামীরে খুন করছে, আমি তাদের কঠিন বিচার চাই।”

শরিফুলের বড় মেয়ে ষষ্ঠ এবং ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। নীলফামারী থেকে কুমিল্লায় এনে তাদের নতুন স্কুলে ভর্তি করানোর পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। সেই স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল।

ঘটনার খবর পেয়ে নীলফামারী থেকে ছুটে আসেন শরিফুলের শ্বশুর মতিউর রহমান, শাশুড়ি নুর বানু ও অন্যান্য স্বজন। বুধবার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

শরিফুলের শ্বশুর মতিউর রহমান বলেন, “রাতে ফোন করে বলা হয়েছিল জামাই অসুস্থ। এসে দেখি লাশ। খেলার সময় কথাকাটাকাটির জন্য একজন মানুষকে মেরে ফেলা—এটা কোনো সভ্য সমাজে হতে পারে না। আমরা দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক অটোরিকশাচালক জানান, হামলার পর শরিফুল নিরাপদে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অভিযুক্তরা তাঁকে অনুসরণ করে আবারও মারধর করে। এরপরই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।

ঘটনার পর থেকে চায়ের দোকানটি বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, হামলার মূল অভিযুক্ত হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছে, তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এছাড়া অভিযুক্তদের পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি অর্থের বিনিময়ে মীমাংসার চেষ্টা চলছে বলেও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে বাগ্‌বিতণ্ডার পর শরিফুলকে কিল-ঘুষি মারা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *