নাঙ্গলকোটে পৌরসভার ময়লার ঝ্যাঁজে জনগনের নাভিশ্বাস!

              আবুল কাশেম গাফুরী\ কুমিল্লার নাঙ্গলকোট পৌর সদরের বাইপাস সড়ক ও রেললাইনের পাশে দীর্ঘদিন ধরে যত্রতত্র পৌরসভার ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা প্রতিদিন ভ্যান ও ট্রাকে করে বাজারের পঁচা আবর্জনা, বিভিন্ন ক্লিনিক-হাসপাতালের মেডিকেল বর্জ্য এবং কসাইখানার দূষিত রক্ত-মাংস এই ভাগাড়ে ফেলছে। এর ফলে বর্জ্যের তীব্র পচা দুর্গন্ধে আশপাশের পুরো এলাকার বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। একটু বৃষ্টি হলেই আবর্জনার স্তূপে পানি জমে তা পঁচে চারদিকে কালচে ও বিষাক্ত তরল ছড়িয়ে পড়ছে। এই ভাগাড়ের ঠিক পাশেই রয়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি, স্কুল, মসজিদ, হাসপাতাল ও মাদ্রাসা। কিন্তু লাখো মানুষের এই ভোগান্তি নিরসনে যেন কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যাথা নেই।

              ব্যস্ততম এই বাইপাস সড়কটি দিয়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা শত শত মালবাহী ট্রাকসহ হাজার হাজার ছোট-বড় যানবাহন ও পথচারী চলাচল করে। প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাদের স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে এই ভাগাড়ের দূষিত বাতাস গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে তারা ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগসহ নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নাঙ্গলকোট পৌরসভায় বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। এটি কাগজে-কলমে ‘প্রথম শ্রেণির পৌরসভা’ হলেও এখানকার বাসিন্দারা প্রথম শ্রেণির নাগরিক সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত; উল্টো তারা পৌর করের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন। কোনো রকম নাগরিক সুযোগ-সুবিধা মূল্যায়ন বা বৃদ্ধি ছাড়াই গত ১০ বছরে পৌরকর বাড়ানো হয়েছে কয়েক গুণ। অথচ বাড়েনি সেবার মান। উল্টো পৌরসভায় কোনো কাজে গেলে পদে পদে নাগরিকদের নাজেহালের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পৌরসভার অধিকাংশ রাস্তার বেহাল দশা, নেই পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। বেশিরভাগ সড়কে রোড লাইট না থাকলেও কর আদায় করা হচ্ছে নিয়মিত।

              ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের আমলে ৫নং নাঙ্গলকোট ইউনিয়নের ১৪টি গ্রাম ও মৌকরা ইউনিয়নের ৫টি গ্রামসহ মোট ১৯টি গ্রামকে ৯টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করে নাঙ্গলকোট পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে সাবেক নাঙ্গলকোট ইউনিয়নকে বিলুপ্ত করে পৌরসভার উত্তরের অংশ ৫নং মক্রবপুর ইউনিয়ন এবং পশ্চিমের অংশ ১২নং হেসাখাল ইউনিয়ন নামে দু’টি আলাদা ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়েছিল।

              সরেজমিনে একাধিক পথচারী ও চালক এই প্রতিবেদককে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই বাইপাস সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় ময়লার ভাগাড়ের পাশ দিয়ে পার হতে হলে অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ সেকেন্ড দম বন্ধ করে রাখতে হয়। আর সামান্য বৃষ্টি হলেই ময়লা ধোয়া বিষাক্ত পানি রাস্তায় জমে থাকে, তখন পায়ে হেঁটে পার হওয়া তো দূরের কথা, গাড়িতে চলাচল করাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

              এ বিষয়ে ডক্টরস অ্যান্ড মেডিকেল স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন নাঙ্গলকোট (ডিমসান)-এর সভাপতি নজির নোবেল বলেন, সব ধরনের বর্জ্য পরিবেশের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এই বর্জ্য অব্যবস্থাপনা বহু রোগের নিরব উৎস। পঁচা খাদ্যের উচ্ছিষ্ট অংশ মশা-মাছির বংশ বিস্তারের উত্তম স্থান, যা এলাকায় ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া ও ডায়রিয়া ছড়াতে পারে। অন্যদিকে বর্জ্য পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন বিষাক্ত গ্যাস হাঁপানি ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণ হতে পারে, যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশু এবং বয়োজ্যেষ্ঠরা। এছাড়া, হাসপাতালের বর্জ্যে থাকা রাসায়নিক উপাদান মানবশরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে দিতে পারে, যার ফলে সাধারণ রোগও সহজে ভালো হতে চায় না। চিকিৎসাবিদ্যায় একটি কথা আছে- প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো।

              এ ব্যাপারে নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মো. আবু রায়হান বলেন, আবর্জনা ফেলার জন্য পৌরসভার নিজস্ব নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না থাকায় সাময়িকভাবে সড়কের ধারেই তা ফেলতে হচ্ছে। একটি স্থায়ী গার্বেজ স্টেশন করার জন্য পৌরসভার অধীনে জায়গা খোঁজা হচ্ছে। তবে জনদুর্ভোগ কমাতে বর্তমানে যেখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে, সেখানে একটি বাউন্ডারি ওয়াল বা সীমানা প্রাচীর দেয়ার পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি।

              ভুক্তভোগী পৌরবাসীর দাবি, শুধু বাউন্ডারি বা আশ্বাসের ফুলঝুরি নয়; এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বুক চিরে যাওয়া সড়ক থেকে ময়লার ভাগাড়টি দ্রæত স্থায়ীভাবে অপসারণ করে একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ডাম্পিং স্টেশন গড়ে তোলা হোক।

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *