
নিজস্ব প্রতিনিধি॥ কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত উপজেলার ৮টি প্রধান সড়কের মধ্যে ৫টি সড়কেই বর্তমানে যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব সড়কে বড় বড় গর্ত, খানাখন্দ ও ভাঙাচোরা অবস্থার কারণে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
প্রায় প্রতিদিন এসব সড়কে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, বাস, সিএনজি অটোরিকশা, ইজিবাইক, রিকশা ও ভ্যান আটকা পড়ছে। ছোট যানবাহন উল্টে গিয়ে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে চালক ও যাত্রীরা আহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণে মারাত্মক বিঘœ ঘটছে।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোলঘেঁষে অবস্থিত ২০২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের চান্দিনা উপজেলায় বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামে প্রবেশের জন্য ৭টি প্রধান সড়ক রয়েছে। আবার উপজেলা সদরের বুক চিরে আছে আরো একটি প্রধান সড়ক। ওই সড়কটিরও দু’পাশ মহাসড়কের সাথে সংযুুক্ত।
এই ৮টি সড়কের মধ্যে ইলিয়টগঞ্জ-শুহিলপুর সড়ক, কুটুম্বপুর-কালিয়াচর এবং মাধাইয়া-রহিমানগর সড়ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ৩ সড়ক নিজ জেলাসহ পাশ্ববর্তী চাঁদপুর জেলার সাথে সংযুক্ত। এর মধ্যে কুটুম্বপুর-কালিয়াচর সড়কটি তুলনামূলক চলাচলযোগ্য থাকলেও ইলিয়টগঞ্জ-শুহিলপুর এবং মাধাইয়া-রহিমানগর সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।
বিশেষ করে মাধাইয়া-রহিমানগর সড়কের অর্ধেক অংশের সংস্কার কাজ ৮ মাস আগে টেন্ডারের মাধ্যমে শুরু হলেও এখন পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়কের কাজও সম্পন্ন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। উল্টো সংস্কারের নামে খোঁড়াখুঁড়ি করে সড়কের বিভিন্ন অংশ এমনভাবে ফেলে রাখা হয়েছে যে, কোথাও কোথাও পায়ে হেঁটেও চলাচল করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে এসব স্থানে পানি জমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
একই ভাবে উপজেলা সদরের প্রধান সড়ক, ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের কাঠেরপুল থেকে চান্দিনা বাজার হয়ে পালকি সিনেমা হল পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার অংশে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য বড় বড় গর্ত। এসব গর্ত এড়িয়ে যান চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। কোথাও কোথাও স্থানীয়রা দুর্ঘটনা এড়াতে বড় গর্তে লাল পতাকা টানিয়ে সতর্কতার ব্যবস্থা করেছেন।
চান্দিনা উপজেলা গেট থেকে হাজী সাহেবের মোড় পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কটিও বেহাল অবস্থায় রয়েছে। বড় বড় গর্ত ভরাটের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে এমপি’র নির্দেশে স্থানীয়রা বিভিন্ন ভাঙা ভবনের কংক্রিট, ইটের খোয়া ও বালু ফেলে সাময়িকভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু এতে স্থায়ী সমাধান তো দূরের কথা, বরং চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উপজেলা সদরের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মাধ্যমে উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৬টি ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং পৌর এলাকার হাজারো মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করেন। এসব সড়কের মধ্যে চান্দিনা-শ্রীমন্তপুর সড়কের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক যুগ ধরে সড়কটির ৩ কিলোমিটারের বেশি অংশে কার্পেটিং উঠে গেছে। অনেক স্থানে মেকাডাম স্তরের আর অবশিষ্ট নেই। বৃষ্টির সময় এটি কাদাময় আর শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে একেবারে অচল হয়ে পড়ে।
এছাড়া, চান্দিনা-বদরপুর সড়কের সংস্কার কাজ প্রায় এক বছর আগে শুরু হলেও কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি, তদারকির অভাব এবং প্রকৌশল বিভাগ ও প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে এখনও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন চালক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা জানান, প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব সড়কে চলাচল করতে হচ্ছে। জরুরি রোগী হাসপাতালে নিতে গিয়েও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পন্য পরিবহন খরচ দ্বিগুন গুনতে হচ্ছে।
চান্দিনা-শ্রীমন্তপুর সড়কের সিএনজি চালক শাহ পরান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পৌরসভার ভিতরের এমন খারাপ রাস্তা আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। প্রতিদিন সিএনজি মেরামত করাতে হয়। কখনও এটা ভেঙ্গে যায়, কখনও ওইটা নষ্ট হয়ে যায়। সারা দিনে যা আয় করি তার অর্ধেকেরও বেশি মেরামত করাতে খরচ হয়।
মাধাইয়া-রহিমানগর সড়কের প্রতিদিনের যাত্রী সহকারী অধ্যাপক মাসুমুর রহমান জানান, সড়কটির সংস্কার কাজ শুরু করেছে প্রায় ৮ মাস। এখনো এক কিলোমিটার সড়কও সংস্কার হয়নি। ভাঙ্গা সড়ক যাতায়াতে একদিকে অপচয় হচ্ছে সময় অপরদিকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। সড়কটির সংস্কার কাজের গতি ফিরাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
উপজেলা প্রকৌশল অফিস থেকে জানা যায়, এক বছর আগে সংস্কার কাজ শুরু করা চান্দিনা-বদরপুর সড়কটির মাত্র ২০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ৮ মাস আগে সংস্কার কাজ শুরু হওয়া মাধাইয়া-রহিমানগর সড়কের কাজ সম্পন্ন হয় ১০ শতাংশেরও কম।
এ ব্যাপারে চান্দিনা উপজেলা প্রকৌশলী মো. গোলাম উল্লাহ জানান, আমি এ উপজেলায় নতুন এসেছি। সবগুলো সড়কের বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে মাধাইয়া-রহিমানগর সড়ক ও চান্দিনা-বদরপুর সড়কের সংস্কার কাজ যে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান করছে তাকে আমি কাজের পরিকল্পনা প্রদানের কথা বলেছি। কিভাবে দ্রুত কাজগুলো করানো যায় সে বিষয়ে কাজ করবো।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানান, সড়কগুলো আসলেই খারাপ অবস্থা। তবে ইতিমধ্যে চান্দিনা-শ্রীমন্তপুর সড়কটি টেন্ডার হয়েছে। কাঠেরপুল থেকে সিনেমাহল পর্যন্ত বাজারের সড়কটির জন্য জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এছাড়া যেসব সড়কে সংস্কার কাজ চলমান সেগুলো দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে বলা হয়েছে। তিনি জানান, টানা বর্ষনে কাজে কিছুটা ধীরগতি চলছে। বর্ষা শেষে পুরোদম কাজ চলবে।