
ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের নতুন সমীকরণে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের প্রস্তুতি এগোলেও, সফরের রাজনৈতিক পথের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ।
ভারতের পক্ষ থেকে চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দুই দিনের সফরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে সফর নিয়ে যোগাযোগও চলছে। কিন্তু ঢাকা স্পষ্ট করে দিয়েছে, সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হলে আগে প্রয়োজন একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’—আর সেই পরিবেশ তৈরির কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে শেখ হাসিনার ইস্যু।
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে বাংলাদেশ ও ভারতের অবস্থান এখনো এক হয়নি। শুধু প্রত্যর্পণ নয়, ভারত থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডও ঢাকার অসন্তোষের কারণ হয়ে উঠেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরকে এসব প্রশ্ন থেকে আলাদা করে দেখছে না বাংলাদেশ। সফর হলে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রথম সরাসরি বৈঠকে বসবেন। ফলে এই সফরকে দুই দেশের নতুন রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
দিল্লি থেকে ঢাকায় বার্তা
ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর দিল্লি গিয়ে ভারতের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এরপর তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, বাংলাদেশের অবস্থান এবং সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ঢাকার প্রত্যাশার বিষয়টি তিনি দিল্লিতে তুলে ধরেছেন।
দুই দেশই এখন প্রকাশ্যে সম্পর্ককে ‘ইতিবাচক ও ভবিষ্যতমুখী’ রাখার কথা বলছে। ভারতের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, এমন কোনো সমস্যা নেই যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে পর্দার আড়ালে শেখ হাসিনার প্রশ্নটি এখনো সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক ফাইল।
রাজ্যসভা থেকে ব্রিফিং—সতর্ক দিল্লি
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রশ্ন ভারতের রাজ্যসভাতেও উঠেছে। তবে ভারত সরকার এ বিষয়ে সরাসরি বিস্তারিত জবাব এড়িয়ে গেছে।
একইভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়েও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করা হলেও মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল শুধু বলেন, তাঁকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ আগেই জানানো হয়েছে এবং সফর নিয়ে অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সতর্ক ভাষা ইঙ্গিত দিচ্ছে—দিল্লিও এখনো সব সমীকরণ মেলাতে পারেনি।
৫ আগস্টের পর বদলে যায় পরিবেশ
দিল্লিতে শেখ হাসিনার অনলাইন মতবিনিময়ের পর দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ আরও জটিল হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ এ ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানায় এবং ভারতের দেওয়া আশ্বাস রক্ষা হয়নি বলে অসন্তোষ প্রকাশ করে।
পরবর্তীতে ভারত জানায়, ওই মঞ্চ থেকে বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে যেসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলো ভারত সরকার অনুমোদন করে না। তবে ঢাকার কূটনৈতিক মহলে ধারণা, শুধু এই ব্যাখ্যায় সম্পর্কের অস্বস্তি কাটেনি।
আলোচনার টেবিলে থাকবে বড় ইস্যু
যদি সফর চূড়ান্ত হয়, তাহলে শুধু শেখ হাসিনা নয়—দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসবে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য
- ট্রানজিট ও যোগাযোগ
- জ্বালানি সহযোগিতা
- সীমান্ত ব্যবস্থাপনা
- আঞ্চলিক নিরাপত্তা
- গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন
বিশেষ করে চলতি বছরের ডিসেম্বরে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকায় বিষয়টি আলোচনায় বাড়তি গুরুত্ব পেতে পারে।
সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এক বৈঠকেই সব অমীমাংসিত প্রশ্নের সমাধান হবে—এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির মুখোমুখি বৈঠক অন্তত রাজনৈতিক সংলাপের নতুন দরজা খুলতে পারে।
দিল্লিরও বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্কের কৌশলগত প্রয়োজন রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখা হয়।
অন্যদিকে ঢাকা চাইছে, নতুন সম্পর্কের ভিত্তি হোক পারস্পরিক সম্মান ও সংবেদনশীল ইস্যুতে বাস্তব অগ্রগতির ওপর।
ফলে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক যোগাযোগই নির্ধারণ করতে পারে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর হবে, নাকি বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে দুই দেশের দূরত্ব কতটা কমে, তার ওপরই এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে সেই অধ্যায়ের প্রথম পৃষ্ঠা কবে লেখা হবে।