ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করেছে ওয়াশিংটন। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি চুক্তিটি নিয়ে সংরক্ষিত অবস্থান ব্যক্ত করে বলেছেন, এতে তাঁর কিছু ভিন্নমত রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘মরিয়া হয়েই’ এই চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত নৌ অবরোধ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হলো।

খামেনি জানান, শুরুতে তিনি চুক্তিটির পক্ষে ছিলেন না। তবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের আশ্বাসের পর তিনি এতে সম্মতি দেন। চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা।

চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, শর্ত পূরণের আগে ইরান কোনো আর্থিক সুবিধা বা নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি পাবে না। সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী, ইরানকে প্রথমে প্রমাণ করতে হবে যে তারা আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলবে এবং তাদের আচরণে পরিবর্তন আনবে। এর অংশ হিসেবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি আর্থিক সহায়তা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভ্যান্স জানান, চুক্তিটি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে এবং আগামী ৬০ দিন ধরে কারিগরি ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলবে। তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত আলোচনার জন্য শিগগিরই সুইজারল্যান্ড সফর করতে পারেন, যদিও নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তাঁর ভাষায়, “ইরান খুব সহজ অংশীদার নয়, তাই সময় নির্ধারণে সতর্কতা প্রয়োজন।”

মূলত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের কথা থাকলেও মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। কারণ চুক্তিতে ইতোমধ্যেই দূরবর্তী উপায়ে স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, পরবর্তী আলোচনা পর্যায়ে দুই দেশের প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসবেন।

ইরানের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক লিখিত বিবৃতিতে খামেনি বলেন, চুক্তি প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়েই কাজ করেছেন। তবে তাঁর মতে, ট্রাম্প এই সমঝোতা বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করেছেন। যদিও বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি জানান, চুক্তির কিছু বিষয়ে তাঁর ভিন্নমত রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন যে ভবিষ্যতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এর অর্থ এই নয় যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান মেনে নিচ্ছে।

চুক্তি নিয়ে এটিই ছিল মোজতবা খামেনির প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্য। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তাঁর বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মার্চ মাসে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তাঁকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

অন্যদিকে ট্রাম্প খামেনির মন্তব্যের সরাসরি জবাব না দিলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে আশা প্রকাশ করেন যে লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় ওয়াশিংটন ইসরায়েলের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল। ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার কিছু সদস্যের সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি এ মন্তব্য করেন।

এদিকে সমালোচকদের উদ্দেশে জেডি ভ্যান্স বলেন, বাস্তবতা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে জাতীয় নিরাপত্তার সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নাম উল্লেখ করে তাঁদের অবস্থানের সমালোচনা করেন।

১৪টি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গঠিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তিতে সংঘাতের অবসান, অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন থেকে বিরত রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে, যদিও এতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অর্থায়নের বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে চুক্তি ঘোষণার পরও অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রেখেছে। বৃহস্পতিবার লেবাননে এক হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েল বলছে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের সংঘাত ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে আলাদা। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তির শর্তগুলো মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *