এসএসসি ফল পুনর্নিরীক্ষণে প্রায় ১৩ লাখ আবেদন, এবার খাতা হবে পুনর্মূল্যায়নও

এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল নিয়ে পরীক্ষার্থীদের আগ্রহ ও অসন্তোষের বড় প্রকাশ ঘটেছে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ৪ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য প্রায় ১৩ লাখ আবেদন করেছে। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্রের জন্য আবেদন পড়েছে ১০ লাখ ৫৬ হাজারের বেশি। ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্যও জমা পড়েছে ২ লাখ ৩১ হাজারের বেশি আবেদন।

এবারের পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুধু নম্বরের যোগ-বিয়োগে ভুল হয়েছে কি না, তা দেখার বদলে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নও করা হবে। ফলে বিপুলসংখ্যক খাতা নতুন করে যাচাই করতে গিয়ে বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে শিক্ষা বোর্ডগুলো।

আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, এবার উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক পরীক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।

প্রায় ১৩ লাখ আবেদন

১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফল প্রকাশের পর ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন নেওয়া হয়।

শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১১টি বোর্ডের অধীনে ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি আবেদন করেছে। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষার জন্য ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি আবেদন জমা পড়েছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে। এই বোর্ডের ৯৪ হাজার ২৩৬ জন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষার জন্য ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য ৫৮ হাজার ১২টি আবেদন করেছে।

অন্যান্য বোর্ডের মধ্যেও পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। কুমিল্লা বোর্ডে ৩৫ হাজারের বেশি, রাজশাহীতে ৩৯ হাজারের বেশি, চট্টগ্রামে ৩৯ হাজারের বেশি, যশোরে ২৮ হাজারের বেশি, বরিশালে ১৭ হাজারের বেশি, সিলেটে ২০ হাজারের বেশি, দিনাজপুরে ৩৭ হাজারের বেশি এবং ময়মনসিংহে ২৭ হাজার ৬৭৬ জন পরীক্ষার্থী আবেদন করেছে।

এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪০ হাজারের বেশি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ২০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছে।

এবার শুধু নম্বর যোগ-বিয়োগ নয়

এত দিন ফল পুনর্নিরীক্ষণের নামে মূলত উত্তরপত্রে দেওয়া নম্বরের যোগ-বিয়োগ ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করা হতো। উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো ভুল হয়েছে কি না, তা নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ ছিল না।

ফলে কোনো পরীক্ষার্থী নিজের প্রাপ্ত নম্বর নিয়ে অসন্তুষ্ট হলেও খাতার মূল্যায়ন যথাযথ হয়েছে কি না, সেটি যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত ছিল। দীর্ঘদিন ধরে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়ার দাবি থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

এবার সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। পুনর্নিরীক্ষণের আওতায় উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে পরীক্ষার্থীদের খাতা নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কমেছে পাসের হার, বেড়েছে উদ্বেগ

এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও।

১১টি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ মোট পরীক্ষার্থীর বড় একটি অংশই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

এবার মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি। পাসের হার কমে যাওয়ায় ফল নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবই পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের সংখ্যায় পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগেও বদলেছে অনেকের ফল

প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের পর অনেক পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। নম্বরের যোগ-বিয়োগের ভুল ধরা পড়ার পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করেছে, আবার কেউ কেউ নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের পর ২৮৬ জন পরীক্ষার্থী নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। ফেল থেকে পাস করেছিল ২৯৩ জন।

এ ধরনের ঘটনা উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফল তৈরির প্রক্রিয়ায় আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরীক্ষক সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ

শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মানসম্মত পরীক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাতা মূল্যায়নের চাপ। ফলে অনেক সময় তাড়াহুড়োর কারণে ভুলভ্রান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়।

এবার পুনর্মূল্যায়নের আওতায় বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র নতুন করে দেখতে হবে। ফলে প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ পরীক্ষক নিয়োগ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করাই এখন শিক্ষা বোর্ডগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ বাড়ালেই হবে না; মূল মূল্যায়ন প্রক্রিয়াতেই ভুলের সুযোগ কমাতে পরীক্ষক নির্বাচন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, তদারকি ও প্রযুক্তির ব্যবহার আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। এতে পরীক্ষার ফল নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তি দুটোই কমবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বদেশ রেস্তোরাঁ এন্ড পাটি সেন্টার