
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে নিজের নামে ট্রাম্প মিমকয়েন চালু করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই উদ্যোগকে অনেকেই তাঁর ক্রিপ্টোবান্ধব অবস্থানের প্রতীক হিসেবে দেখলেও, সময়ের সঙ্গে এটি তাঁর পরিবারের জন্য অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন ক্রিপ্টো-সম্পর্কিত উদ্যোগ থেকে গত বছরে ট্রাম্পের আয় ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সময়ে এই মিমকয়েনে বিনিয়োগ করা অধিকাংশ বিনিয়োগকারী বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বাজারে আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই ট্রাম্প মিমকয়েনের বাজারমূল্য প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু পরে এর মূল্য দ্রুত কমতে থাকে। বর্তমানে বাজারমূল্য নেমে এসেছে প্রায় ৪০ কোটি ডলারে, অর্থাৎ সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ৯৭ শতাংশেরও বেশি মূল্য হারিয়েছে টোকেনটি।
যদিও টোকেনের দামে বড় পতন হয়েছে, এতে ট্রাম্পের আর্থিক ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম। কারণ তাঁর আয় মূলত টোকেনের মূল্যবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রতিবার টোকেন কেনাবেচা হলেই লেনদেন ফি, লাইসেন্সিং ফি এবং অন্যান্য রাজস্ব থেকে আয় হয়। ট্রাম্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও মিমকয়েনের মোট সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে বাজারে লেনদেন অব্যাহত থাকলেই তারা রাজস্ব পেয়ে থাকে।
সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান কারণ শেয়ারবাজারের উত্থান। তবে বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরে তাঁর সম্পদ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে ক্রিপ্টো খাত থেকে। যদিও সেই আয় সরাসরি ক্রিপ্টোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং টোকেন-ভিত্তিক ব্যবসা ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে এসেছে।
ট্রাম্প আরও জানান, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নিজের আর্থিক বিষয় তিনি প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের তত্ত্বাবধানে রেখেছেন এবং আইন মেনেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও তাঁর ছেলে এরিক ট্রাম্প দেখভাল করেন। বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোসম্পদ সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, তিনি বিস্তারিত জানতেন না, তবে এতে কোনো বেআইনি বিষয় নেই বলেও মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল এলএলসি থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হয়েছে। বিভিন্ন টোকেন বিক্রি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৫২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি আয় হয়েছে বলে জানা গেছে।
মিমকয়েন মূলত এমন একটি ক্রিপ্টো টোকেন, যার প্রকৃত অর্থনৈতিক ভিত্তি খুবই দুর্বল। এসব টোকেনের দাম অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত বাড়তে পারে, আবার একইভাবে হঠাৎ বড় পতনও ঘটতে পারে। ফলে এগুলোকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জল্পনানির্ভর বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্পের নামে চালু হওয়া টোকেনগুলোর ক্ষেত্রে শুরুতে জানানো হয়েছিল, সংশ্লিষ্টরা একবারে সব টোকেন বিক্রি করতে পারবেন না; নির্দিষ্ট সময় ধরে ধাপে ধাপে তা বাজারে ছাড়তে হবে। তবে প্রতারণার ঝুঁকি কম থাকলেও এমন টোকেন যে লাভজনক বিনিয়োগ হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
অনেকে রাজনৈতিক সমর্থন, নতুন প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ কিংবা উচ্চ মুনাফার আশায় ট্রাম্প মিমকয়েন কিনেছিলেন। আবার বড় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ তৈরি করা। গত মে মাসে ট্রাম্প মিমকয়েনের শীর্ষ ২২০ জন বিনিয়োগকারীর জন্য বিশেষ ব্ল্যাক-টাই নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৫ জন বিনিয়োগকারী ট্রাম্পের সঙ্গে বিশেষ ভিআইপি সংবর্ধনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
সব মিলিয়ে গত এক বছরে ট্রাম্প মিমকয়েন অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর জন্য লাভজনক হয়নি। তবে এই উদ্যোগ থেকে সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন ট্রাম্প ও তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো।