দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ স্থানীয় এলাকাবাসীসহ মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রী সাধারন মনোহরগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে মহাসড়কের পাশে বছরের পর বছর ধরে ফেলা হচ্ছে ময়লা


আবুল কালাম আজাদ\ কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের মনোহরগঞ্জ উপজেলার নাথেরপেটুয়ায় নোয়াখালীগামী লেনে প্রবেশ করতেই দূর থেকে নাকে ভেসে আসে তীব্র দুর্গন্ধ। দুর্গন্ধের কারণে চলাচলকারী বাস যাত্রীরা পড়েন দুর্ভোগে। তবে মহাসড়কের পাশ দিয়ে পায়ে হেঁটে চলাচলকারীদের অবস্থা আরও খারাপ। নাক চেপে ধরা ছাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকা পার হওয়া কষ্টকর ব্যাপার। অবস্থাটা এমন হওয়ার কারণ হচ্ছে- নোয়াখালীমুখী লেনের পাশে বছরের পর বছর ধরে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। জায়গাটি এখন পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে।
স্থানীয়রা বলছেন, এভাবে মহাসড়কের পাশে অবাধে ময়লা ফেলতে থাকায় পরিবেশ দূষণ চরম আকারে পৌঁছেছে। স্থানীয়দের জনজীবন হয়ে পড়েছে দুর্বিষহ। তীব্র দুর্গন্ধের পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। এছাড়া এভাবে মহাসড়কের পাশে ময়লা ফেলার কারণে পরিবেশ দূষণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন সচেতন মহল।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শুধুমাত্র মনোহরগঞ্জের নাথেরপেটুয়া বাজার এলাকাই নয়; কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের একই উপজেলার খিলা ও বিপুলাসার বাজার এলাকায়ও দেখা গেছে ময়লার ভাগাড়।
নাথেরপেটুয়া এলাকার অন্তত ৩ জন বাসিন্দা বলেন, বাজারের বেশিরভাগ ময়লা-আবর্জনা এনে ফেলা হচ্ছে মহাসড়কের পাশেই। ৫ বছর ধরে এখানে ময়লা ফেলার কারনে বড় ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এতে দুর্গন্ধে ব্যবসায়ী, যানবাহনের চালক, যাত্রীসহ পথচারীরা রয়েছেন চরম দুর্ভোগে। শুধুমাত্র মহাসড়কের পাশেই নয়; বাজারের মধ্যখান দিয়ে গেছে লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথ। সেই রেলপথের পশ্চিম পাশেও এমন ময়লার ভাগাড় রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নাথেরপেটুয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার ভাগাড়টি অন্তত ২০০ মিটার দীর্ঘ। দীর্ঘদিন ধরে ময়লা ফেলায় স্তূপটি অনেকটাই উঁচু হয়ে গেছে। কাছে যেতেই তীব্র উৎকট দুর্গন্ধে যেকোন মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসার অবস্থা। বাতাসে আশপাশের এলাকাগুলোতে ছড়াচ্ছে ময়লার দুর্গন্ধ। মহাসড়ক ঘেঁষে ফেলা এসব ময়লার পরিমাণ বেশি হওয়ায় ময়লা-আবর্জনা মহাসড়কের মধ্যেও এসে পড়ছে।
নাথেরপেটুয়া ফাজিল মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মো. সাইদুর রহমান বলেন, এভাবে ময়লা ফেলার কারণে মহাসড়কের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। আমরা বিষয়টি কয়েকবার লিখিতভাবে উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। একই স্থানে সওজের মালিকানাধীন খালটিও ভরাট করা হয়েছে। সেটি উদ্ধারসহ এভাবে ময়লা ফেলা বন্ধের দাবিতে মানববন্ধনও করেছি। কিন্তু আজও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। প্রতিনিয়ত ময়লার স্তুূপ বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সওজ কর্তৃপক্ষ এসবের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা না করায় দিনদিন পরিবেশ দূষণ বেড়ে চলেছে।
নোয়াখালী থেকে ঢাকাগামী একটি পরিবহনের বাস চালক মানিক মিয়া বলেন, চলাচলের সময় নাথেরপেটুয়া, খিলা ও বিপুলাসার বাজারে ময়লার ভাগাড় থেকে প্রচন্ড দুর্গন্ধ নামে ভেসে আসে। কয়েক বছর ধরে ময়লার স্তুূপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। দুর্গন্ধের কারণে যাত্রীদের বমি আসার উপক্রম হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন, কয়েকদিন পর এই ময়লার ভাগাড়ের মধ্যে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। এতে ধোঁয়ার কারণে পরিবেশ দূষণ আরও বেড়ে চলেছে। দীর্ঘদিন ময়লা ফেলা বন্ধে কোন উদ্যোগ নেয়নি সওজ ও উপজেলা প্রশাসন।
ময়লার ভাগাড়ের পাশের একটি কনফেকশনারী দোকানের ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দিন যত যাচ্ছে ময়লা ফেলার জায়গাটির আকার ততই দীর্ঘ হচ্ছে। জায়গাটি বাজারের এক পাশেও নয়; বলা চলে বাজার বা বাসস্ট্যান্ডের মধ্যখানেই এই ময়লা ফেলা হচ্ছে। ময়লার কারণে ওই স্থান দিয়ে হেঁটে চলাচল করাও দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
এভাবে পরিবেশ দূষণ বেড়েই চলায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক হুমায়ুন কবির মানিক। তিনি বলেন, এটা কান্ডজ্ঞানহীন একটি কাজ। সওজ মহাসড়কের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য কাজ করে, কিন্তু তাঁরা এভাবে মহাসড়ক ঘেঁষে ময়লা ফেলার বিষয়টি মনিটরিং করে না। সওজ ও স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে এভাবে দূষণ বেড়েই চলেছে। এছাড়া, যারা ময়লা ফেলে এতো সুন্দর মহাসড়কের পরিবেশ নষ্ট করছে, তাঁদের রুচিবোধটা কেমন? কোন বিদেশি যখন এই মহাসড়কের পাশ দিয়ে চলাচল করবে- তখন তিনি বাংলাদেশের মানুষের রুচিবোধ নিয়ে কি বার্তা পাবেন? মূল কথা হচ্ছে- পবিরেশ দূষণ বন্ধে সওজ ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে মানুষকে সচেতন করতে হবে, আইনের প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিটি স্থানে বিলবোর্ড স্থাপন করা যেতে পারে- ‘এখানে ময়লা ফেলা দন্ডনীয় অপরাধ’।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাজালা পারভীন রুহি বলেন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া, বাজার পরিচালনা কমিটিসহ সংশ্লিষ্টদের বেশ কয়েকবার বলা হয়েছে- এভাবে পরিবেশ দূষণ না করে ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করার জন্য। কিন্তু কেউই বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। এভাবে পরিবেশ দূষণ বন্ধে শিগগিরই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। পাশাপাশি যারা পরিবেশ দূষণ করছে- তাঁদেরকে সতর্ক করতেও উপজেলা প্রশাসন কাজ করবে।
বিষয়টি নজরে আনা হলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, কুমিল্লার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আদনান ইবনে হাসান বলেন, এভাবে ময়লা ফেলে মহাসড়কের পরিবেশ ও সৌন্দর্য নষ্ট করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে যারা ময়লা ফেলে পরিবেশ দূষণ করছে- তাঁদের মধ্যে কয়েকটি পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আমরা এরই মধ্যে চিঠি দিয়েছি। কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে এভাবে ময়লা ফেলার বিষয়টি সেভাবে আমাদের নজরে আসেনি। তবে খোঁজ নিয়ে শিগগিরই এনিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা মহাসড়কের পাশে ময়লা ফেলা বন্ধের জন্য কাজ করছি। সামনে এসব বিষয়ে আমরা কঠোর হবো।
