
পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ লন্ডন থেকে এশিয়ার একটি দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা কালে গ্রেফতার হয়েছেন। পরিকল্পনা ছিলো দুবাইয়ে ট্রানজিট শেষে গন্তব্যে পৌঁছানোর। তবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ক্যামেরা ধরা পড়ে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই তার যাত্রা থেমে যায়।
বিমানবন্দরের অত্যাধুনিক এআইভিত্তিক ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তিতে শনাক্ত হওয়ার পর ইন্টারপোলের তথ্যভান্ডার মিলিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে দুবাই পুলিশ। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এতথ্য জানা গেছে।
দুবাই পুলিশের বরাতে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি তিনি (বেনজীর) লন্ডন থেকে সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হন। নির্ধারিত ফ্লাইটে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রানজিটে নামার পর অন্য যাত্রীর মতোই ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আসেন তিনি।
পুলিশের ওই কর্মকর্তার দাবি, বিমানবন্দরের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা তার মুখমণ্ডল স্ক্যান করে। স্ক্যানের তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধীদের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে বেনজীর আহমেদের নামে থাকা ইন্টারপোল সতর্কতা সংকেত (নোটিশ) সামনে আসে। এরপর দুবাই পুলিশের ইন্টারপোল সমন্বয় শাখা বিষয়টি যাচাই শেষে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে আটক করা হয়।
ওদিকে,
দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জাতীয় সংসদেও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি এ ঘটনাকে বাংলাদেশ পুলিশের ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এর মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো।
রোববার (১৪ই জুন) জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে গত ১২ই জুন বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ। একই দিন আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ, ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) কর্তৃক আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হতে পারবো। পাশাপাশি জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।”
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বিধি অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠাতে হবে। এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদনের কাজ শুরু করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হবে। একই সঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রাখবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা আশাবাদী, প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অতি দ্রুত বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।”
বাংলাদেশ পুলিশের ৩০তম মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ই এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তবে কর্মজীবনের শেষদিকে নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ র্যাব এবং এর সাত সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্তদের মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।
তাছাড়া, ২০২৪ সালে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের আগে তার বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। এসব অভিযোগ তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তের এক পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দেন আদালত।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, বেনজীর আহমেদ ও তার স্বজনদের নামে শত শত বিঘা জমি, একাধিক ফ্ল্যাট, রিসোর্ট, শেয়ার এবং ব্যাংক হিসাব রয়েছে, যার বড় অংশের উৎস নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তদন্ত শুরুর আগেই তিনি দেশ ত্যাগ করেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতি মামলা দায়ের হয় এবং আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
ওদিকে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির পর থেকে তাকে গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত প্রচেষ্টা চলছিল। দুবাইয়ে তার গ্রেপ্তার সেই প্রচেষ্টারই ফল।
বেনজীর আহমেদের প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সফল হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো সাবেক পুলিশ প্রধানকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার এটি হবে অন্যতম একটি আলোচিত উদাহরণ।
Ref: thikana