স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজন সেবার মানোন্নয়ন

\ সুমিত বণিক \

              বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে মানুষের তুলনায় বরাদ্দ খুব কম। কথাগুলো একেবারে মিথ্যা নয়। কিন্তু আজকের বাস্তবতা শুধু এতটুকুতে আটকে নেই। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেই মানুষ ভালো চিকিৎসা পাবে- এমন সরল বিশ্বাস এখন আর যথেষ্ট নয়। কারণ সরকারি হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা রোগী, উপজেলা হাসপাতালে ডাক্তার না পাওয়া মা কিংবা ডায়াবেটিসের ওষুধ কিনতে হিমশিম খাওয়া বৃদ্ধ মানুষ- তাদের কাছে বাজেটের অঙ্ক নয়, সেবার বাস্তব চেহারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

              ‘স্বাস্থ্য খাতে ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব’ শিরোনামের সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য খাতের বড় বরাদ্দের কথা এসেছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক খবর। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, চিকিৎসাশিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা- সব মিলিয়ে সরকার এবার স্বাস্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়- এমন একটি বার্তা এতে আছে। একজন জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আমি এই বার্তাকে স্বাগত জানাই। কারণ স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ মানে শুধু হাসপাতাল বানানো নয়; এটি মানুষের কর্মক্ষমতা, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং দেশের ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার বিনিয়োগ।

              তবে প্রশ্ন হলো, এই টাকা কোথায় যাবে, কিভাবে খরচ হবে, আর সাধারণ মানুষ তার কতটা সুফল পাবে? পত্রিকায় প্রকাশিত ‘অদক্ষ ব্যবহারই স্বাস্থ্য খাতের বড় সংকট’ শিরোনামের আলোচনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে সমস্যা শুধু টাকার অভাব নয়; বড় সমস্যা হলো বিদ্যমান সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার, অব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ঘাটতি। সেখানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই বিদ্যমান সম্পদ দিয়ে সেবার পরিমাণ অনেক বাড়ানো সম্ভব। এই কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক জায়গায় ভবন আছে, কিন্তু ডাক্তার নেই; যন্ত্র আছে, কিন্তু চালানোর লোক নেই; বরাদ্দ আছে, কিন্তু সময়মতো ওষুধ নেই।

              স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের আলোচনায় দুর্নীতি, সক্ষমতার ঘাটতি, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নিম্নমানের চিকিৎসাশিক্ষা, উপকরণের অভাব, ওষুধ ও সেবার অযৌক্তিক উচ্চমূল্য, পদশূন্যতা, বদলি-পদোন্নতি-প্রশিক্ষণের জটিলতা, ল্যাবের দুর্বলতা এবং দালালচক্রের হস্তক্ষেপের মতো সমস্যাগুলো উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি স্বাস্থ্য খাতে অনুমোদিত ২ লাখের বেশি পদের মধ্যে বড় একটি অংশ শূন্য। গ্রামীণ এলাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে শূন্যতার হার আরো বেশি। এই অবস্থায় শুধু বড় বাজেট ঘোষণা করলে হবে না, মাঠ পর্যায়ে জনবল না দিলে মানুষ সেই বাজেটের সুফল পাবে না।

              বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় অন্যায় হলো, যার টাকা আছে, সে তুলনামূলক ভালো চিকিৎসা পায়; আর গরিব মানুষ অনেক সময় চিকিৎসা না নিয়েই বাড়ি ফিরে যায়। শহরের বড় হাসপাতালে ভিড়, গ্রামে সেবা সংকট, নগর বস্তিতে স্বাস্থ্যসেবার অনিশ্চয়তা- এসব আমাদের উন্নয়নের গল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। স্বাস্থ্য শুধু রোগ সারানোর বিষয় নয়, এটি ন্যায্যতার প্রশ্ন। একজন রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক, কৃষক, গৃহকর্মী কিংবা চরাঞ্চলের মা- তাঁদের স্বাস্থ্য অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

              ‘ইতিবাচক ধারায় স্বাস্থ্য খাত: বাজেটে নতুন সম্ভাবনা’ শিরোনামটি তাই আশার জায়গা তৈরি করে। কিন্তু এই আশা বাস্তব হবে তখনই, যখন বাজেটকে কাগজ থেকে হাসপাতালের বিছানায়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে, ওষুধের তাক এবং রোগীর হাসিতে নামিয়ে আনা যাবে। আমাদের দরকার এমন স্বাস্থ্যনীতি, যেখানে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে ন্যূনতম চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও জরুরি সেবা নিশ্চিত থাকবে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ওষুধের ডিজিটাল হিসাব থাকবে। কোন যন্ত্র নষ্ট, কত দিন ধরে নষ্ট, কে দায়ী- এসব তথ্য জনগণের জানার সুযোগ থাকতে হবে।

              আরেকটি বড় কাজ হলো প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা- এসব এখন ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে। অথচ আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো অনেকটাই রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার দিকে বেশি ঝুঁকে আছে। স্কুলে স্বাস্থ্যশিক্ষা, এলাকায় রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং, পুষ্টিসচেতনতা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ- এসবকে বাজেটের কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে।

              সব শেষে স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার মানে শুধু মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম, গবেষক এবং সাধারণ মানুষ- সবাইকে যুক্ত করতে হবে। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটি শুধু কাগজে থাকলে হবে না; সেখানে রোগীর প্রতিনিধি, নারী প্রতিনিধি ও স্থানীয় নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ দরকার। ভালো সেবার পুরস্কার এবং দুর্নীতি বা অবহেলার শাস্তি- দু’টিই দৃশ্যমান হতে হবে।

              স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অঙ্ক আমাদের আশাবাদী করে, কিন্তু চোখ বন্ধ করে উচ্ছ¡াস করার সময় এখনো আসেনি, বরং এখনই সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়ার সময়। কারণ প্রতিটি টাকা যদি সঠিক জায়গায় না যায়, তাহলে বাজেট বড় হলেও মানুষের কষ্ট ছোট হবে না। বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে মানবিক রাষ্ট্র বানাতে হলে স্বাস্থ্যকে দয়া নয়, অধিকার হিসেবে দেখতে হবে। বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত সংসদের কাগজে নয়, মাপা হবে গ্রামের হাসপাতালে শিশুর চিকিৎসা, মায়ের নিরাপদ প্রসব, বৃদ্ধের ওষুধ পাওয়া এবং দরিদ্র রোগীর সম্মানজনক সেবায়।

              তবু হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বড় বড় সাফল্য দেখিয়েছে- টিকাদান কর্মসূচি, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমানো, কমিউনিটি ক্লিনিকের বিস্তার, দুর্যোগের সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা- এসব আমাদের আশা দেখায়। তাই আজকের প্রয়োজন হলো সেই অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়া। সরকার যদি স্বাস্থ্য বাজেটকে শুধু বরাদ্দের অঙ্ক হিসেবে না দেখে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে এই খাত সত্যি বদলে যেতে পারে।

              এ জন্য সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত মাঠ পর্যায়ের সেবা শক্তিশালী করা। উপজেলা হাসপাতাল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকে ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বড় শহরের হাসপাতালে চাপ কমাতে হলে গ্রামের মানুষকে গ্রামেই ভালো প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে। একই সঙ্গে যে পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্য পড়ে আছে, সেগুলো দ্রæত পূরণ করা জরুরি। শুধু ভবন বানালেই স্বাস্থ্যসেবা হয় না, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো প্রশিক্ষিত জনবলই স্বাস্থ্যব্যবস্থার আসল প্রাণ।

              দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। কোন হাসপাতালে কত টাকা বরাদ্দ হলো, কত ওষুধ কেনা হলো, কোন যন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, কতজন রোগী সেবা পেল- এসব তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা উচিত। এতে জনগণের আস্থা বাড়বে, অপচয় কমবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাজের মানও উন্নত হবে। সরকারি হাসপাতালের সেবা যদি সহজ, দ্রæত ও সম্মানজনক হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ বেসরকারি খাতে অতিরিক্ত খরচ করতে বাধ্য হবে না।

              তৃতীয়ত, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে জাতীয় অগ্রাধিকার করতে হবে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ক্যান্সার, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং পুষ্টিহীনতা- এসব রোগ ধীরে ধীরে পরিবারকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই স্কুল, কর্মস্থল, গ্রাম ও শহরের মহল­াভিত্তিক স্বাস্থ্যসচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং সহজ পরামর্শসেবা চালু করা সময়ের দাবি। রোগ হওয়ার পর ব্যয়বহুল চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ সব সময় সস্তা, মানবিক এবং কার্যকর।

              সব শেষে বলা যায়, স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার কোনো এক দিনের কাজ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক জাতীয় অঙ্গীকার। সরকার, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ- সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে গরিব মানুষ চিকিৎসা খরচের জন্য হাসপাতালে যেতে ভয় পাবে না; যেখানে গ্রামের মা নিরাপদ প্রসবের নিশ্চয়তা পাবে; যেখানে বৃদ্ধ মানুষ নিয়মিত ওষুধ পাবে; যেখানে প্রতিটি নাগরিক সম্মানের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা পাবে। সরকারের হাতে এখন সুযোগ আছে বড় বাজেটকে বড় পরিবর্তনে রূপ দেয়ার। সঠিক পরিকল্পনা, সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আগামী দিনে আরো ন্যায়ভিত্তিক, শক্তিশালী ও মানবিক হয়ে উঠবে- এই আশাই আমাদের এগিয়ে রাখুক। লেখক: জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *