লুটে নিচ্ছে গোমতী নদীর দু’তীরের মাটি

            দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ\ কুমিল্লা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গোমতী নদীর দু’তীরের মাটি লুটের মচ্ছব চলছে। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই আদর্শ সদর উপজেলার পালপাড়া থেকে গোলাবাড়ি পর্যন্ত নদীর তীর থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে পাওয়ার টিলারে ভরে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে দিচ্ছে স্থানীয় অসাধু চক্র। এসব মাটি ইটভাটাসহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়। মাটি কেটে নেয়ায় তীরের ফসলি জমি, পাশের শহর রক্ষা বাঁধ ও সেতু ঝুঁকিতে পড়বে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন।

            সম্প্রতি সরেজমিনে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, আদর্শ সদর উপজেলায় নদীর উত্তর তীরে পাঁচ কিলোমিটার এবং দক্ষিণ তীরে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় মাটি লুট চলছে। পাওয়ার টিলার দিয়ে মাটি বিভিন্ন ইটভাটা ও বসতবাড়িতে ব্যবহারের জন্য নেয়া হয়। নদীর উৎসমুখ কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার কটকবাজার ও গোলাবাড়ি থেকে শুরু করে পালপাড়া পীরবাড়ির সামনে পর্যন্ত উভয় তীরে মাটি কাটার প্রক্রিয়া চলছে প্রকাশ্যে। এতে গোমতীর বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বাঁধসংলগ্ন পাকা সড়কের পিচ উঠে গেছে।

            নদীর দক্ষিণ তীরে দুর্গাপুর, ভাটপাড়া, পালপাড়া পীরবাড়ি, কাপ্তানবাজার, চানপুর মাস্টারবাড়ি, শালধর এবং সামারচর এলাকায় অন্তত ২০টি ট্রাক্টর দিয়ে মাটি তুলতে দেখা গেছে। এসব ট্রাক্টর চলাচলের জন্য সড়কের অংশ কেটে নদীর বাঁধের ভেতর দিয়ে চলার পথ তৈরি করা হয়েছে।

            অন্যদিকে নদীর উত্তর পাড়ে ছত্রখিল এলাকায় থাকা পুলিশ ফাঁড়ির সামনেই চলছে মাটি কাটার কাজ। বৈদ্যুতিক খুঁটির গোড়া ও নদীতীরের গাছের নিচ থেকেও মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে। চানপুর বেইলি সেতু এবং কাপ্তান বাজার পশ্চিম অংশের মাটিও কাটতে দেখা গেছে। নদীর দু’তীরে মোট ৭টি ঘাট থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

            এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে মাটি কেটে নেয়া হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বা প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

            কয়েকজন ট্রাক্টরচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতি ট্রাক্টর মাটি ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। আরেকজন স্থানীয় মাটি ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা এই মাটি ট্রাক্টরে করে ইটভাটা ও আশপাশের বিভিন্ন নির্মাণস্থলে সরবরাহ করি। রাজনৈতিক ব্যক্তি ও কিছু প্রশাসনিক লোককে ম্যানেজ করে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি।’

            গোমতী নদীর চর দখল করে কোটি কোটি টাকার মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়নের আড়াইওড়া মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. জহিরুল ইসলাম। স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়ধারী এই ব্যক্তি বিগত ১৭ বছর পার করার পর এবার স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতার যোগসাজশে গোমতীর মাটি কাটছেন।

            অভিযোগ স্বীকার করে জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘নদীর পাড়সংলগ্ন আমার একটি পুকুর আছে। আমি সেখান থেকে মাটি কাটছি। মাটি কাটার সঙ্গে আমি একা জড়িত না। স্থানীয় নেতারা ও প্রশাসনের কিছু লোক আমার সঙ্গে আছেন।’

            এ ব্যাপারে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. রেজা হাসান বলেন, ‘জনগণকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমি পাউবোকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার নির্দেশনা দিয়েছি। গোমতীর তীর থেকে মাটি কাটা বা বালু তোলার কোনো অনুমতি জেলা প্রশাসন থেকে দেয়া হয়নি।’

            রেজা হাসান আরও বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। জেলা প্রশাসন বরাবরই এসব কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সজাগ রয়েছে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তা নিয়ে যেখানে মাটি কাটা হয়, সেখানে অভিযান চালানো হবে।’

            -আজকের পত্রিকার সৌজন্যে

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *