বেগম রোকেয়া দিবসে একই সঙ্গে অদম্য নারী সম্মাননায় ভূষিত মা ও মেয়ে


বেলাল ভূঁইয়া\ বেগম রোকেয়া দিবস ২০২৫ উপলক্ষে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক “অদম্য নারী সম্মাননা” পেয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মা ও মেয়ে। দু’জনই শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন।
শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে লাকসাম রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফারজানা চৌধুরী স্বর্ণা এ বছর অদম্য নারী সম্মাননায় ভূষিত হন। তিনি বৈবাহিক সূত্রে লাকসাম উপজেলার উত্তর নরপাটি ইউনিয়নের বাসিন্দা।
জনাবা ফারজানা চৌধুরী লাকসাম উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে নিজেকে একজন দক্ষ ও উদ্যমী শিক্ষিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পরপর তিনবার শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকার সম্মাননা অর্জন করেন।
করোনাকালীন সময়ে (২০২০-২০২১) তিনি ৩ শতাধিক অনলাইন ক্লাস পরিচালনার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয় পর্যায়ে সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন (ইঞঠ) ও বাংলাদেশ বেতারে শতাধিক শিক্ষামূলক ক্লাস পরিচালনা করেন।
ব্যক্তিজীবনে ফারজানা চৌধুরীর স্বামী মোঃ মনিরুজ্জামান মোল্লা বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলায় সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে কর্মরত। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও শিক্ষার প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ থেমে থাকেনি। সংসার, সন্তান ও চাকরির পাশাপাশি তিনি বিএসএস ও এমএসএস ডিগ্রিতে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। পাশাপাশি কুমিল্লা ল কলেজ থেকে আইন বিষয়েও পড়াশোনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমার এই সাফল্যের পেছনে আমার স্বামীর সহযোগিতা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।’
শুধু মেয়েই নয়; একই দিনে অদম্য নারী সম্মাননায় ভূষিত হন তাঁর মা মোসাম্মদ বুলবুল আক্তার চৌধুরী। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার খয়েরদির চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত আছেন এবং ‘সফল জননী’ হিসেবে সম্মাননা লাভ করেন। বুলবুল আক্তার চৌধুরীর জীবনসংগ্রাম ছিল অত্যন্ত কঠিন। মাত্র নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তিনি সংসার ও সন্তান সামলে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যান। স্বামীর একান্ত সহযোগিতায় তিনি এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন এবং সর্বশেষ এমএড ডিগ্রি অর্জন করেন।
জানা যায়, এসএসসি পাসের পরপরই তিনি প্রথম সন্তানের মা হন। এরপর শুরু হয় জীবনের কঠিন লড়াই- যা তিনি ধৈর্য, অধ্যবসায় ও পারিবারিক সহযোগিতায় সফলভাবে অতিক্রম করেন। তাঁর ৩ সন্তানের মধ্যে একমাত্র পুত্র বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে সিনিয়র প্রটোকল অফিসার হিসেবে কর্মরত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। দ্বিতীয় সন্তান ফারজানা চৌধুরী লাকসাম উপজেলা থেকে অদম্য নারী হিসেবে ভূষিত হন। তৃতীয় সন্তান ফারহানা চৌধুরী অনন্যা সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তার স্বামী মোঃ সাইফুল ইসলাম বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত। আরো জানা যায়, বুলবুল আক্তার চৌধুরীর স্বামী মোঃ বজলুল আমিন ধর্মপাশা উপজেলার একজন স্বনামধন্য ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন।
উল্লেখ্য, ৯ই ডিসেম্বর পালিত বেগম রোকেয়া দিবস ২০২৫-এর প্রতিপাদ্য ছিল- ‘আমিই রোকেয়া’। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মা ও মেয়ের একসঙ্গে অদম্য নারী সম্মাননা প্রাপ্তি নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে এক অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই দিনে মা ও মেয়ের এই বিরল অর্জন সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁদের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেছেন।
