
বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করেছে। পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে আজ মঙ্গলবার থেকে ইউরেনিয়াম জ্বালানি প্রবেশ করানো শুরু হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে।
চুল্লিতে জ্বালানি বসানোর পর তাপ উৎপাদনের মাধ্যমে পানি বাষ্পে পরিণত হবে এবং সেই বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। সরকার বলছে, এটি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। জ্বালানি প্রবেশ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগবে। এরপর বিকিরণ ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করতে আরও ৩৪ দিন প্রয়োজন হবে। ধাপে ধাপে চুল্লির সক্ষমতা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে। আগামী আগস্টে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। পুরো সক্ষমতায় পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে প্রায় ১০ মাস।
রূপপুর প্রকল্প দেশের সবচেয়ে বড় একক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এখানে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ থেকে ১২ শতাংশ সরবরাহ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় এটি দীর্ঘমেয়াদে কম খরচে বিদ্যুৎ দেবে এবং পরিবেশ দূষণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া থেকে প্রথম চালান হিসেবে পারমাণবিক জ্বালানি দেশে আসে। পরে আরও কয়েকটি চালান আনা হয় এবং সেগুলো কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রূপপুরে সংরক্ষণ করা হয়। এখন সেই জ্বালানি ব্যবহার শুরু হচ্ছে। প্রতিটি জ্বালানি বান্ডিলে শতাধিক রড থাকে এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক বান্ডিল চুল্লির কেন্দ্রে বসানো হয়। একবার জ্বালানি বসালে প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাওয়া গেলেও এর নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যবহৃত জ্বালানি তেজস্ক্রিয় হওয়ায় তা আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে বিশেষ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ ও অপসারণ করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং দক্ষ জনবল তৈরি করেই এই প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে।
প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়েছে এবং ব্যয়ও বেড়েছে। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলার সংকটসহ নানা কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন সময়সূচি অনুযায়ী, প্রথম ইউনিট ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকার বলছে, পারমাণবিক শক্তির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। তবে পুরোপুরি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে আরও সময় লাগবে এবং সবকিছু নির্ভর করছে নিরাপদ ও সফল পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার ওপর।