
একটি জয় কখনো কখনো শুধুই জয় নয়, হয়ে ওঠে একটি প্রজন্মের স্মৃতি। মিরপুরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ৮৬ রানের জয়ও তেমনই একটি মুহূর্ত। কারণ, কার্ডিফে ২০০৫ সালের সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর দীর্ঘ ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে আবার হারাতে।
তবে এই জয়ের গল্প শুধু ফলাফলের নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন এক চেহারারও প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে তরুণ পেসার নাহিদ রানার বোলিং ছিল ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। তাঁর গতিময় ও বাউন্সে ভরা বোলিংয়ের সামনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা বারবার অস্বস্তিতে পড়েছেন। অনেক সময় বল বুঝে ওঠার আগেই তা উইকেটকিপারের গ্লাভসে পৌঁছে গেছে।
২৮৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই বিপর্যয়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। ইনিংসের প্রথম বলেই তাসকিন আহমেদের দুর্দান্ত ডেলিভারিতে বোল্ড হন ম্যাথু শর্ট। পরের ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানের শিকার হন মার্নাস লাবুশেন। মাত্র ২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ম্যাচের শুরুতেই চাপে পড়ে সফরকারীরা।
এরপর কুপার কনোলি ও জশ ইংলিস কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও সেই জুটি ভাঙেন নাহিদ রানা। ইংলিসকে আউট করার পর নাহিদের উদযাপনও ম্যাচে বাড়তি উত্তেজনা যোগ করে। পরে অ্যালেক্স ক্যারি ও কনোলি চতুর্থ উইকেটে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়লেও আবারও আঘাত হানেন নাহিদ। ক্যারিকে ফিরিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার শেষ বড় আশাটুকুও নিভিয়ে দেন।
১০ ওভারে মাত্র ৪১ রান দিয়ে ৪ উইকেট নেওয়া নাহিদ ছিলেন বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের প্রাণভোমরা। তাঁর গতির সামনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ কখনোই স্বস্তি খুঁজে পায়নি। ক্যামেরন গ্রিনের ফিফটি পরাজয়ের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আর ফিরে পায়নি অস্ট্রেলিয়া।
এর আগে ব্যাট হাতে বাংলাদেশের বড় সংগ্রহ গড়ে দেওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন মোসাদ্দেক হোসেন। শুরুতে সাইফ হাসান দ্রুত আউট হয়ে গেলেও তানজিদ হাসান ও নাজমুল হোসেন শান্ত ৯৬ রানের জুটিতে ইনিংসের ভিত গড়ে দেন। তানজিদের ৫৪ ও শান্তর ৬৭ রানের ইনিংস বাংলাদেশকে ভালো অবস্থানে নিয়ে যায়।
তবে মধ্যভাগে দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে আবারও চাপে পড়ে স্বাগতিকরা। সেই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মোসাদ্দেক। তাওহিদ হৃদয়, মেহেদী হাসান মিরাজ ও টেলএন্ডারদের নিয়ে তিনি ধৈর্য ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের অসাধারণ সমন্বয় দেখান। ৭০ বলে ৭০ রানের অপরাজিত ইনিংসে ছিল ৭টি চার ও ৩টি ছক্কা। কয়েকবার জীবন পেলেও সেই সুযোগগুলো পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে দলকে ৮ উইকেটে ২৮৪ রানের লড়াকু সংগ্রহ এনে দেন তিনি।
বৃষ্টির কারণে ম্যাচে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও ডিএলএস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হয়। তবে স্কোরকার্ডের বাইরে এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল মাঠে বাংলাদেশের আধিপত্য। ব্যাটিং, বোলিং এবং আত্মবিশ্বাস— সব বিভাগেই অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে এগিয়ে ছিল স্বাগতিকরা।
অনেকে হয়তো বলবেন, এটি অস্ট্রেলিয়ার পূর্ণশক্তির দল ছিল না। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো কখনোই সাধারণ ঘটনা নয়। আর ২১ বছর পর সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ যে জয়টি পেল, তা নিঃসন্দেহে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষ এক অধ্যায় হয়ে থাকবে।