
ষ্টাফ রিপোর্টার\ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের ৫০০ উপজেলার মধ্যে বর্তমানে মাত্র পাঁচটি উপজেলায় ১০০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে। এ কারণে পর্যায়ক্রমে বর্তমানে ৩১ থেকে ৫১ শয্যার প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
গত শনিবার (১১ই জুলাই) ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘ডিএমসি ডে-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সরকারের স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আরো পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর বিদ্যমান শূন্যপদ দ্রæত পূরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চায়। পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, ডায়াবেটিস, বøাড প্রেশার, কিডনি রোগ, হৃদরোগ কিংবা ক্যানসারের মতো বিষয়ে আগেভাগে স্বাস্থ্যসম্মত পরামর্শ পেলে অনেক রোগের নিরাময় বা নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।
তিনি জানান, জনগণ যাতে শুরুতেই স্বাস্থ্য পরামর্শ পায়, সে লক্ষ্যে সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এদের মধ্যে ৮০ শতাংশ হবেন নারী হেলথ কেয়ারার, যারা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাখাতের পর এবারই দেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চলতি জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে এই বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু বাজেট বৃদ্ধি নয়; ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, পেরিফেরাল ভাসকুলার স্টেন্ট, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন ফাইবার, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও ট্যাক্স কমানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্যাক্স সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পাশাপাশি সব হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে বিরতিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রæত চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে বিশেষায়িত শিশুচিকিৎসা রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজলভ্য হবে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এমন এক মহৎ প্রতিষ্ঠান, যেটি আমাদের সামনে এক জীবন্ত ইতিহাস, ‘কালের সাক্ষী’। শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রেই নয়; ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় ২০২৪ সালের বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান- প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এই ক্যাম্পাসে শুধু দেশ-বিদেশের সেরা চিকিৎসকই তৈরি হয়নি, শিক্ষক, গবেষক, সমাজনেতা কিংবা মুক্তিযোদ্ধাসহ এমন মহৎ মানুষ তৈরি হয়েছেন, যারা অন্যের জীবন রক্ষায় নিজেদের জীবন ও স্বার্থ বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি, যোগ করেন তিনি।
ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। একইসঙ্গে তিনি সেই মহান মানুষদের স্মরণ করেন, যারা আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া এই প্রতিষ্ঠান আজও মানুষের সেবায় অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ এই যাত্রাপথে ঢাকা মেডিকেল কলেজ দেশের সব প্রান্তের মানুষের কাছে পরিচিত। বিশেষ করে রাজধানীর মানুষের সার্বক্ষণিক নির্ভরতার জায়গা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এই হাসপাতালের প্রতিটি কক্ষ কিংবা করিডোরে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষের আনন্দ-বেদনার কাব্য রচিত হয়। এখানে যেমন অনেক জীবনের অবসান হয়, তেমনি অসংখ্য নতুন জীবনের সূচনাও ঘটে। স্টেথোস্কোপের এক প্রান্তে যখন একজন ডাক্তারের কান থাকে, অন্য প্রান্তে তখন স্পন্দিত হয় একটি মানুষের জীবন। চিকিৎসক ও রোগীকে ঘিরে আবর্তিত হয় একটি পরিবারের অগাধ বিশ্বাস।
এর আগে সকাল ১০টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিলন চত্বরে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে ‘ডিএমসি ডে-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।