ডিসির দেওয়া পড়ার চ্যালেঞ্জ, সাদিয়ার হাতে জিপিএ-৫

অভাবের সংসারে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই সহায়তার আশায় জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়েছিলেন দিনাজপুরের সাদিয়া আফরিনের মা আরফা বেগম। কিন্তু সেদিন শুধু আর্থিক সহায়তার আশ্বাসই নয়, জেলা প্রশাসক সাদিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন আরও বড় এক দায়িত্ব—নিয়ম মেনে পড়াশোনা করা এবং প্রতি সপ্তাহে এসে সেই পড়ার হিসাব দেওয়া।

সেই শুরু। এরপর প্রতি বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হতো সাদিয়া। সঙ্গে থাকত সপ্তাহজুড়ে করা পড়া। জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম তার পড়া শুনতেন, ভুল ধরিয়ে দিতেন এবং পরের সপ্তাহের জন্য নতুন পড়া নির্ধারণ করে দিতেন। এভাবেই সপ্তাহ পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর।

ফলও মিলেছে। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সাদিয়া। দিনাজপুর সদর উপজেলার কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে এবার ৪৩ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করেছে ২২ জন। তাদের মধ্যে একমাত্র সাদিয়াই পেয়েছে সর্বোচ্চ এই ফল।

সাহায্য চেয়ে গিয়ে পেল পড়ার চ্যালেঞ্জ

দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকায় সাদিয়াদের বাড়ি। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে গত বছর জুলাইয়ে মেয়ের পড়াশোনার জন্য সহায়তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন তার মা আরফা বেগম।

এরপর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। সাদিয়ার সঙ্গে পড়াশোনা নিয়ে কথা বলেন রফিকুল ইসলাম। বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। প্রথম সাক্ষাতে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি সাদিয়া।

সেদিনই জেলা প্রশাসক তাকে সাত দিনের পড়া দিয়ে পরের বুধবার আবার আসতে বলেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট করে দেন পড়াশোনার রুটিন—রাতে দুই ঘণ্টা, ভোরে দুই ঘণ্টা পড়া; রাত ১০টায় ঘুম এবং ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠা। বিকেলে এক ঘণ্টা খেলাধুলার সময়ও রাখা হয়। স্কুল থাকুক বা না থাকুক, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

সাদিয়ার কাছে এটি ছিল এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। আর সে চ্যালেঞ্জই ধীরে ধীরে তার অভ্যাসে পরিণত হয়।

গণশুনানির ফাঁকে চলত পড়াশোনার হিসাব

প্রতি বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যেত সাদিয়া। সেদিন গণশুনানিতে নানা সমস্যা নিয়ে মানুষের ভিড় থাকত। সেই ব্যস্ততার মধ্যেই সময় বের করে সাদিয়ার পড়া নিতেন জেলা প্রশাসক।

ভুল হলে সংশোধন করে দিতেন। নতুন বিষয় বুঝিয়ে দিতেন। আবার পরের সপ্তাহের জন্য পড়া দিয়ে পাঠাতেন বাড়িতে।

সাদিয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় যেন হয়ে উঠেছিল আরেকটি পাঠশালা।

প্রথমদিকে জেলা প্রশাসকের সামনে পড়া দিতে ভয় লাগত সাদিয়ার। তবে নিয়মিত পড়া শেষ করার চেষ্টা করত সে। তার ভাষায়, আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি জেলা প্রশাসক তাকে সবচেয়ে বেশি সাহস জুগিয়েছেন।

পড়ার টেবিলও নেই ঘরে

সাদিয়াদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার চিত্রও খুব স্বচ্ছল নয়। মাসিমপুর সরকারপাড়ায় অন্যের লিচুবাগানের ভেতর সরু পথ পেরিয়ে যেতে হয় তাদের টিনের ঘরে। প্রায় দুই শতক জমির ওপর তৈরি বাড়িটির একাংশে বাবা-মা ও ছোট বোনের থাকার জায়গা, অন্য অংশে সাদিয়া ও তার আরেক বোন থাকেন।

ঘরে নেই পড়ার আলাদা টেবিল। কখনো বিছানায়, কখনো মায়ের সেলাই মেশিনের ওপর বই রেখে পড়াশোনা করতে হয়েছে তাকে। আলমিরার ওপর সাজানো থাকে তার বইপত্র।

সাদিয়ার বাবা মো. সেলিম চালকলের শ্রমিক। মা আরফা বেগম সংসারের কাজ সামলে বাড়িতে সেলাই করেন। তিন মেয়ের মধ্যে সাদিয়া বড়।

অভাবের সংসারে নিয়মিত পড়াশোনার খরচ চালানো সহজ ছিল না। তবু মেয়েদের পড়ালেখা করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন বাবা-মা।

আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি মিলেছে প্রেরণা

সাদিয়ার মা আরফা বেগম জানান, তিনি মূলত মেয়ের বই কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতা শুধু অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নিয়মিত পড়ার খোঁজ নেওয়া, পড়া দেওয়া এবং পড়া শোনা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে সাদিয়াকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে পরে সাদিয়াকে সাত হাজার টাকা আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।

সাদিয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলী বলেন, বিদ্যালয় থেকে এবার একমাত্র সাদিয়াই জিপিএ-৫ পেয়েছে। জেলা প্রশাসক বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং সাদিয়ার পড়াশোনার বিষয়েও খোঁজ রাখতেন। তার এই সাফল্যে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আনন্দিত।

সাফল্যের পরও সামনে বড় স্বপ্ন

ফল প্রকাশের পর সাদিয়ার পরিবার আবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যায়। জিপিএ-৫ পাওয়ায় জেলা প্রশাসক তাকে অভিনন্দন জানান এবং মিষ্টিমুখ করান।

সাদিয়ার এখন স্বপ্ন আরও বড়। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যেতে চায় সে। নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি অভাবের সংসারে বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে চায়।

জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম জানান, প্রথম দিন সাদিয়ার সঙ্গে কথা বলেই তার মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ দেখতে পেয়েছিলেন। তাই তাকে একটি চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছিল। সাদিয়া সেই চ্যালেঞ্জকে গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা ও বাড়ির কাজ করেছে।

সাদিয়ার গল্পটি তাই শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প নয়। এটি এমন এক শিক্ষার্থীর গল্প, যার ঘরে পড়ার টেবিল ছিল না, পরিবারের সামর্থ্যও ছিল সীমিত; কিন্তু নিয়মিত পড়াশোনা, উৎসাহ আর একজন দায়িত্বশীল অভিভাবকের মতো মানুষের সহযোগিতা তাকে স্বপ্নের আরও কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

এখন সাদিয়ার সামনে নতুন অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ে তার সবচেয়ে বড় পুঁজি—নিজের পরিশ্রম, পরিবারের স্বপ্ন এবং কঠিন সময়েও হাল না ছাড়ার অভ্যাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বদেশ রেস্তোরাঁ এন্ড পাটি সেন্টার