
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে চলমান হাম পরিস্থিতির মধ্যে বাদ পড়া শিশুদের টিকাদানে নতুন করে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করছে সরকার। আজ শনিবার থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশব্যাপী এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। চলতি বছরের ৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনে যেসব শিশু টিকা পায়নি, মূলত তাদেরই এবার কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে।
রাজধানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে আজ বিশেষ ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতও উপস্থিত থাকবেন।
সাত মাসেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি হাম
দেশে গত মার্চের শুরুতে হাম ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় সাত মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ২০১ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৮৫ হাজার ৮৩৩ জন। এ সময়ে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২১ হাজার ১৫ জনের। হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৪ জনে।
টিকার লক্ষ্যমাত্রায় ভুল
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবের ঘাটতির কারণেই এবারের বিশেষ ক্যাম্পেইনের প্রয়োজন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এপ্রিল মাসে জাতীয় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন শুরুর সময় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই বয়সসীমার শিশুর সংখ্যা নির্ধারিত হিসাবের চেয়ে প্রায় ৪৪ লাখ বেশি।
মূল ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পরও বিভিন্ন এলাকায় টিকা না পাওয়া শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের জরিপেও শহর ও গ্রামাঞ্চলে বাদ পড়া শিশুর তথ্য উঠে আসে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার প্রতিটি উপজেলা থেকে শিশুর সংখ্যা সংগ্রহ করে সেই হিসাবের ভিত্তিতে টিকাদান পরিচালনা করা হবে। আগের ভুলত্রুটি এড়াতে মাঠপর্যায়ের তথ্যও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারির পরামর্শ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; হাম ছড়িয়ে পড়ার এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেসব অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আইসোলেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিতে হবে।
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেনের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে এখন সংক্রমণের ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করা জরুরি। এসব এলাকায় কোনো শিশু যাতে টিকাদান থেকে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, হাম মোকাবিলায় টিকাদানই প্রধান উপায়। নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে হামের সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে শুধু বাদ পড়া শিশুদের টিকা দিলেই হবে না; সংক্রমণের উৎস শনাক্ত, রোগীদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।