👁 62 Views

বাঙালির বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

            রাসেল আহমেদ\ ১৬ই ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির গৌরবময় বিজয়ের দিন। জাতির বহু কাক্সিত বিজয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আবারও ফিরে এসেছে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বরে এসেছিল চুড়ান্ত বিজয়। এই বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল গোটা বাঙালি জাতি। ৫৩ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই দিনে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবগাঁথা বিজয় অর্জন করেছিল। ঢাকায় দখলদার পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এই দিনেই স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হয়েছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ৭১’র ৭ই স্বাধীনতার স্পৃহায় জেগে ওঠে বাঙালি জাতি। আর এই স্বাধীনতার তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত জাতিকে স্তব্ধ করতেই ২৫শে মার্চ কালো রাতে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরা মেতে উঠেছিল ইতিহাসের জঘণ্যতম গণহত্যাকান্ডে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই নির্বিচারে চালানো হয়েছিলো হত্যাকান্ড। সেই গণহত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষের ভাগ্যাকাশে নেমে এসেছিল ঘোর অমানিশা। তবে গণহত্যার মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে সেদিন দমিয়ে রাখতে পারেনি পাক হানাদার বাহিনী। বরং ওই হত্যাকান্ডের শোককে তারা শক্তিতে পরিণত করে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অবশেষে এদেশের আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার সূর্য।

            ’৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলার আকাশে দেখা দেয় স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। অবশেষে ঘনিয়ে আসে বিজয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়াদী উদ্যান) পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির নেতৃত্বে আত্মসমর্পণ করে ৯১ হাজার ৫৪৯ হানাদার সেনা। বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে মুজিবনগর সরকারের পক্ষে গ্রæপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারের উপস্থিতিতে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জ্যাকবের তৈরি করা আত্মসমর্পণ দলিলে সই করেন পাকিস্তানের পক্ষে লে. জেনারেল নিয়াজি এবং মিত্রবাহিনীর পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। আর অবিস্মরণীয় সেই মুহূর্তেই বিশ্ববাসীকে অবাক করে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় বাংলাদেশ নামে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাঙালি জাতি পায় লাল-সবুজের একটি জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত এবং মানচিত্র। রক্তাক্ত পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধের এই বিজয় অর্জন ছিল ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি।

            ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে চুড়ান্ত বিজয় অর্জন করে বাঙালি জাতি। পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন করে স্থান লাভ করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। তবে হঠাৎ করে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে গর্জে ওঠেনি তারা। এর পেছনে কাজ করেছে দীর্ঘদিনের অন্যায়, শোষণ, বঞ্চনা, লাঞ্ছনা আর বৈষম্য। যার সূচনা হয়েছিল ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর। দেশ বিভাগের মাত্র এক বছর পরই প্রথম আঘাত আসে ভাষার প্রশ্নে। বাঙালি জাতির মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষাকে পরিবর্তন করে শাসক শ্রেণীর ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করা হয়। সেই থেকে বাঙালির সচেতনতার সূচনা। এরপর একে একে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা, ৬৯’র গণঅভ্যূত্থান, ৭০’র নির্বাচন এবং ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ। যা বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলে। শুরু হয় হানাদারদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার চূড়ান্ত প্রতিরোধ লড়াই, মুক্তিযুদ্ধ। ৯ মাস ধরে চলা সেই মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ আর লুটতরাজের কলঙ্কিত অধ্যায়ের বিপরীতে রচিত হয়েছিল ইতিহাসের আরেকটি মহান অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে ছিল মুক্তিকামী বাঙালির অসম সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের বীরত্বগাথা। ১৭ই এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট করে গঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন বাংলা প্রবাসী সরকার। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয় ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে হানাদার বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে। জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

            সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের দিনে কৃতজ্ঞ জাতি বিন¤্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে দেশের পরাধীনতার ঘানি মোচনে প্রাণ উৎসর্গ করা বীর সন্তানদের। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে নামবে জনতার ঢল। শ্রদ্ধার সাথে তারা শহীদের উদ্দেশে নিবেদন করবেন পুষ্পাঞ্জলি। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সব প্রান্তের মানুষ অংশ নেবে বিজয় দিবসের নানা আয়োজনে। কি শহর? কি গ্রাম? রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সর্বত্রই আজ চলবে বিজয় দিবসের উদযাপন।

            জাতীয় পর্যায়ে এদিন ঢাকায় পত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তববক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টার নেতৃত্বে উপস্থিতিতে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বাংলাদেশে অবস্থনরত বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সবস্ত—রের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।

            দিবসটির তাৎপর্য্য তুলে ধরে পত্রিকাগুলো প্রকাশ করবে বিশেষ সাময়িকী এবং টেলিভিশনে প্রচারিত হবে বিশেষ অনুষ্ঠান। আর দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে নানা অনুষ্ঠান। বিজয় দিবস সরকারি ছুটির দিন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোর প্রধান সড়ক ও সড়ক দ্বীপ জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হবে। রাতে গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় করা হবে আলোকসজ্জা। হাসপাতাল, কারাগার ও এতিমখানাগুলোতে উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হবে। বিজয় দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *