পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের কুমিল্লা অঞ্চলে ১০ বছরে বন্ধ হয়েছে ১২টি ট্রেন

              আবদুল মান্নান মজুমদার \ পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের কুমিল্লা অঞ্চলে ১০ বছরে বন্ধ হচ্ছে ১২টি ট্রেন। ইঞ্জিন ও কোচ সংকটে একের পর এক ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কুমিল্লা অঞ্চলের রেল যোগাযোগে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের নিরব সংকট। গত ৫ বছরে কুমিল্লা-চাঁদপুর, কুমিল্লা-নোয়াখালী ও কুমিল্লা-চট্টগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রুটে একাধিক ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তম্মধ্যে গত ১০ বছরে শুধু মাত্র কুমিল্লা ও লাকসাম অঞ্চলে প্রায় ১২টি ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। এর কারণ হলো ইঞ্জিন ও কোচ সংকট। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষ।

              তাদের অভিযোগ, সাশ্রয়ী মূল্যের লোকাল ট্রেনগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্বঘোষণা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। যাদের কাছে ট্রেন ছিল প্রতিদিন কর্মস্থলে যাওয়া-আসার সহজ ও কম খরচের বাহন। তাদের এখন অনেকটাই নির্ভর করতে হচ্ছে বাস, সিএনজি অটোরিকশা ও অন্যান্য সড়ক পরিবহনের ওপর। একসময় কুমিল্লা অঞ্চলের স্টেশনগুলোতে ট্রেনের অপেক্ষায় মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যেত। লোকাল ট্রেনের বসার সিটে জায়গা না পেয়ে যাত্রীদের দাঁড়িয়ে কিংবা গাদাগাদি করে যাতায়াতের দৃশ্যও ছিল পরিচিত। সেই চিত্র এখন অনেকটাই অতীত।

              রেলওয়ের প্রকাশিত নথিতে কুমিল্লা-চাঁদপুর ও কুমিল্লা-নোয়াখালী রুটে কমিউটার ট্রেনের সেবা ও সময়সূচির তথ্য বলছে, এসব রুটে রেল যোগাযোগের চাহিদা ও গুরুত্ব এখনও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ এসব রুটে নিয়মিত ট্রেন না থাকায় যাত্রীদের ভরসা করতে হচ্ছে ব্যয়বহুল সড়ক পরিবহনের ওপর।

              স্থানীয় যাত্রী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুমিল্লা অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্রেনের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। এর মধ্যে রয়েছে চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটের চার জোড়া ডেমু ট্রেন, চাঁদপুর-ভৈরব লোকাল ১৬১/১৬২, নোয়াখালী-কুমিল্লা রুটের চার জোড়া ডেমু ট্রেন, নোয়াখালী-ঢাকা রুটের নোয়াখালী এক্সপ্রেস ১১/১২, সমতট এক্সপ্রেস ৪৫/৪৬, চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটের নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস ৩৭/৩৮, চট্টগ্রাম-সিলেট রুটের জালালাবাদ এক্সপ্রেস ১৩/১৪ এবং চট্টগ্রাম-কুমিল্লা রুটের দুই জোড়া ডেমু ট্রেন।

              কুমিল্লা অঞ্চলের রেল সংকট নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ট্রেন ও জনবল সংকটের কথা বলা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে নতুন ইঞ্জিন আসার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ইঞ্জিন ও কোচের সংকট যদি দীর্ঘদিনের হয়, তাহলে স্বল্প দূরত্বের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য ট্রেনসেবা নিশ্চিত করতে রেলওয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়? একটি ট্রেনের ইঞ্জিন বা কোচ নষ্ট হলে সেটি মেরামত করা কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু দিনের পর দিন কোনো রুটের ট্রেন বন্ধ থাকলে বিষয়টি আর শুধু যান্ত্রিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে রেল ব্যবস্থাপনার তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প পরিকল্পনা নিয়েও। লোকাল ট্রেন বন্ধের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর।

              একজন শ্রমিক বা দিনমজুরের জন্য প্রতিদিন কয়েক টাকা অতিরিক্ত যাতায়াত খরচও মাস শেষে বড় অঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। আগে ট্রেনে কম খরচে যাতায়াত করতে পারলেও এখন সড়কপথে বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে যানজট, অতিরিক্ত ভিড় এবং যাত্রার অনিশ্চয়তা। কুমিল্লা, লাকসাম, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কর্মজীবী মানুষ প্রতিদিন এক জেলা থেকে অন্য জেলা কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরমুখী হন। তাদের একটি বড় অংশের জন্য দ্রæত ও সাশ্রয়ী রেল যোগাযোগ শুধু সুবিধা নয় জীবনযাত্রার প্রয়োজনও।

              দিনমজুর আবদুল কাদের বলেন, আগে ট্রেনে কম খরচে যাতায়াত করতে পারলেও এখন সড়কপথে বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে যানজট, অতিরিক্ত ভিড় এবং যাত্রার অনিশ্চয়তা। লোকাল ট্রেন বন্ধ হলে তার কয়েকশ কিংবা কয়েক হাজার যাত্রীকে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে একই সঙ্গে বাড়ে বাস ও অন্যান্য সড়ক পরিবহনের ওপর চাপ।

              কুমিল্লা জেলার লাকসাম জংশনের সিনিয়র স্টেশন মাস্টার ওমর ফারুক ভূঁইয়া জানান, গত ১০ বছরে কুমিল্লা ও লাকসাম অঞ্চলে প্রায় ১২টি ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। এর একমাত্র কারণ হিসেবে তিনি ইঞ্জিন ও কোচ প্রস্তুত না থাকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অতীতের তুলনায় রেলযাত্রী বাড়লেও সক্ষমতা বাড়েনি। এছাড়া, অতীতে যখন ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ ছিল, তখনও ট্রেন চলেছে। কিন্তু এখন ঝুঁকিমুক্ত রেলপথ তৈরি হয়েছে, অথচ ট্রেন নেই। রেলপথের ব্যবহার না করেই এর সক্ষমতা হারাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *