দুই মাসের সংকট কাটিয়ে বাড়ছে গ্যাস সরবরাহ, তবু স্বস্তি ফেরেনি সব শিল্পাঞ্চলে

দীর্ঘ প্রায় দুই মাসের সংকটের পর দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। গত তিন দিন ধরে বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের সরবরাহ। তবে বাড়তি গ্যাসের বড় অংশ শিল্প খাতে দেওয়া হলেও রাজধানীসংলগ্ন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে এখনো চাপের ঘাটতি রয়ে গেছে। কোথাও উৎপাদন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, আবার কোথাও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বয়লার ও উৎপাদনযন্ত্র চালানো যাচ্ছে না।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দীর্ঘদিন ধরে এর বিপরীতে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো সরবরাহ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে এসেছে ১৬১ কোটি ঘনফুট এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে ৯৯ কোটি ঘনফুট।

অগ্নিকাণ্ডের পর কমে যায় সরবরাহ

গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায়। একপর্যায়ে দৈনিক সরবরাহ প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে।

১৫ আগস্ট টার্মিনালটি পুনরায় চালু হলে সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মঙ্গলবার এলএনজি থেকে প্রায় ১০১ কোটি ঘনফুট সরবরাহ পাওয়া যায়। ওই দিন মোট গ্যাস সরবরাহ দাঁড়ায় প্রায় ২৬৩ কোটি ঘনফুটে।

সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে শিল্প ও বিদ্যুৎ—দুই খাতেই কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।

বাড়তি গ্যাসে অগ্রাধিকার শিল্পে

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার থেকে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার রাত থেকেই সরবরাহে প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুটের মতো বৃদ্ধি করা হয়।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বাড়তি গ্যাসের বড় অংশ শিল্প খাতে দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও কিছুটা সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো কয়েকটি বড় তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়া।

বাগেরহাটের রামপাল ও পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বর্তমানে কারিগরি কারণে বন্ধ রয়েছে। ফলে চলমান বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং কমাতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।

তিতাস এলাকায় এখনো ঘাটতি

গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও সবচেয়ে বড় বিতরণ কোম্পানি তিতাসের আওতাধীন এলাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ঢাকা, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চল তিতাসের সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২১ জুলাইয়ের আগে তিতাসকে দৈনিক প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হতো। বর্তমানে তা কমে প্রায় ১৩৭ কোটি ঘনফুটে রয়েছে। ফলে শিল্পের পাশাপাশি আবাসিক ও সিএনজি গ্রাহকদেরও আগের মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

এ পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের চার সংগঠন—বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ ও বিটিটিএলএমইএ—গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জিটিসিএলকে দেওয়া চিঠিতে তিতাস এলাকায় শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।

কোথাও স্বস্তি, কোথাও আগের সংকট

গ্যাস সরবরাহের সাম্প্রতিক বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে।

ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকায় গ্যাস সরবরাহ আগের তুলনায় স্বাভাবিক হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের বেশির ভাগ শিল্প এলাকায়ও গ্যাসের চাপ বেড়েছে। ফলে অনেক কারখানা পুনরায় ধারাবাহিক উৎপাদনে ফিরতে শুরু করেছে।

নরসিংদীর মাধবদীসহ কয়েকটি শিল্প এলাকায়ও পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। জেলার বিপুলসংখ্যক শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট কিছুটা কমায় উৎপাদনে গতি ফিরেছে। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে এখনো সমস্যার কথা জানিয়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।

গাজীপুরেও গ্যাসের চাপ বৃদ্ধির পর বেশ কিছু কারখানায় উৎপাদন বেড়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

সাভার-আশুলিয়ায় এখনো চাপের সংকট

তবে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুরের চন্দ্রা, সফিপুর ও কোনাবাড়ীর মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকায় পরিস্থিতি সমানভাবে উন্নত হয়নি।

সাভারের একটি পোশাক কারখানার কর্মকর্তা জানান, উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে তাদের অন্তত ৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়েও কাঙ্ক্ষিত চাপ পাওয়া যায়নি। ফলে বয়লার চালানোসহ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যাহত হচ্ছে।

নরসিংদীর ঘোড়াদিয়া এলাকাতেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। একটি ডাইং কারখানার কর্মকর্তা জানান, দুপুরের পর গ্যাসের চাপ কিছুটা পাওয়া গেলেও তা বয়লার চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। সেখানে প্রয়োজন অন্তত আড়াই পিএসআই চাপ।

অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ বাড়লেও পাইপলাইন ও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বাড়তি গ্যাস সব শিল্পাঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।

শিল্পে ফিরছে উৎপাদনের গতি

নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাসের চাপ ৫ থেকে ৬ পিএসআই পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে কোনো কোনো কারখানা ২৪ ঘণ্টা উৎপাদন চালাতে পারছে।

গাজীপুরের শিল্প উদ্যোক্তারাও বলছেন, গ্যাসের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন কার্যক্রমে গতি ফিরেছে। কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

ব্যবসায়ী সংগঠন বিকেএমইএর পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, অধিকাংশ শিল্পাঞ্চলে আগের তুলনায় গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৫ পিএসআই চাপেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে কিছু এলাকায় চাপ ওঠানামা করছে এবং এখনো কম চাপের সমস্যাও রয়েছে।

সামনে কী?

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে শিল্প খাতে সরবরাহ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।

রামপাল ও পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহের চাপ কিছুটা কমতে পারে। তখন শিল্প খাতে আরও গ্যাস দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে আপাতত বড় প্রশ্ন হচ্ছে—জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও তা কত দ্রুত এবং কতটা সমানভাবে শিল্পাঞ্চলগুলোতে পৌঁছাবে। কারণ সরবরাহ ব্যবস্থার কোথাও স্বস্তি ফিরলেও সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের কয়েকটি এলাকায় এখনো কম চাপের অভিযোগ রয়েছে।

ফলে গ্যাস সংকট কাটার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা গেলেও দেশের সব শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে—এমন পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *