এইচএসসিতে ২৯৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস, বাড়ছে উদ্বেগ

এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। গত বছরের তুলনায় এবার শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, শিক্ষার্থী সংকট ও তদারকির অভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এবার ৯টি সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ৯ হাজার ৩৯০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন।

শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৪২টি। ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫টিতে। গত বছর ছিল ২০২টি। আর এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৯৩টি।

ভোলার মেদুয়া কলেজ এর একটি উদাহরণ। এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে পাঁচজন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কেউই পাস করতে পারেননি। গত বছরও কলেজটি থেকে কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হননি। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে বর্তমানে ৬৭ জন শিক্ষার্থী ভর্তি থাকলেও নিয়মিত ক্লাস না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

একই চিত্র দেখা গেছে টাঙ্গাইলের সখীপুরের সূর্যতরুণ শিক্ষাঙ্গন আবাসিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার চারজন পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করেননি। পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রায় দুই বছরে মাত্র দুই থেকে তিন দিন ক্লাস হয়েছে। নিয়মিত মাসিক ও নির্বাচনী পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি। শুধু ফরম পূরণ করেই তাঁরা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।

শুধু শূন্য পাস নয়, আরও অনেক প্রতিষ্ঠানে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। এবার ৫৭টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ৫ শতাংশের মধ্যে, ২২১টিতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ এবং ৯১১টিতে ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। বিপরীতে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছেন মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠানে।

শিক্ষা খাতের এই পরিস্থিতির পেছনে অপরিকল্পিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, শিক্ষার্থী সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা এবং পাঠদানের অনিয়মকে দায়ী করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাঁদের মতে, দেশে কলেজ ও মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়লেও সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না। চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তির জন্য ২৬ লাখের বেশি আসন থাকলেও চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থী। ফলে ১৫ লাখের বেশি আসন খালি রয়েছে। চার শতাধিক কলেজ ও মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষার্থী আবেদনই করেননি।

আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর গত পাঁচ বছরের ফলাফল ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হবে। ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরপর একাধিক বছর কোনো শিক্ষার্থী পাস না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি বাতিলের সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে একটি ম্যাপিং করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোন এলাকায় কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন এবং কোনগুলো অপ্রয়োজনীয়, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে হবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা বা অনুমোদন দেওয়াই শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে এমন ফল বিপর্যয় থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *