
আফ্রিকার তিন বন্য কুকুরের গল্প যেন ভালোবাসার খোঁজে এক অসাধারণ অভিযানের কাহিনি। সঙ্গীর সন্ধানে তারা পাড়ি দিয়েছে ২ হাজার ৫৬৩ মাইল বা ৪ হাজার ১২৫ কিলোমিটারের বেশি পথ।
জাম্বিয়ার একটি জাতীয় উদ্যান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল তিনটি পুরুষ আফ্রিকান বন্য কুকুর। পথে পড়েছে কুমিরে ভরা নদী, সিংহের ভয় এবং মানুষের তৈরি নানা বিপদ। সব বাধা পেরিয়ে প্রায় ৯ মাসে তারা পৌঁছেছে পূর্ব জাম্বিয়ার লুয়াংওয়া উপত্যকায়। এ যাত্রা আফ্রিকা মহাদেশে কোনো প্রাণীর নথিভুক্ত দীর্ঘতম স্থলপথের যাত্রা হিসেবে রেকর্ড গড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মনটানা স্টেট ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞান সংরক্ষণ ও বাস্তুবিদ্যার অধ্যাপক স্কট ক্রিল শুরু থেকেই কুকুরগুলোর যাত্রার ওপর নজর রাখছিলেন। বন্য কুকুরগুলোর গলায় লাগানো জিপিএস ট্র্যাকিং কলারের মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানা যাচ্ছিল। এ বিষয়ে গবেষণার সহলেখক ক্রিল সিএনএনকে বলেন, ‘প্রতিদিন তাদের গতিবিধি দেখতাম। মনে হতো, এটা সত্যিই অসাধারণ।’
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে আফ্রিকান বন্য কুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে ৭০০টির কম দল এবং পূর্ণবয়স্ক কুকুরের সংখ্যা ১ হাজার ৭০০-এর নিচে। ফলে প্রাণীটি এখন বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় রয়েছে।
বন্য কুকুরেরা সাধারণত দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। একটি দলে সাধারণত একটি প্রভাবশালী পুরুষ ও একটি স্ত্রী কুকুর প্রজননের সুযোগ পায়। দলের অন্য সদস্যদের সামনে তখন দুটি পথ খোলা থাকে; দলের প্রধান হওয়ার অপেক্ষা করা অথবা দল ছেড়ে নতুন সঙ্গীর খোঁজে বেরিয়ে পড়া।
২০২৫ সালের ৬ আগস্ট দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয় তিন কুকুর। তাদের বয়স ছিল তিন বছর। পশ্চিম জাম্বিয়ার কাফু ন্যাশনাল পার্কের মায়ুকুয়ুকু দলে জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুকুরগুলো এরপর শুরু করে দীর্ঘ যাত্রা।
বিপদ এড়িয়ে নতুন ঠিকানায়
জাম্বিয়ান কার্নিভোর প্রোগ্রামের সহযোগিতায় ১৬ বছর ধরে আফ্রিকান বন্য কুকুর নিয়ে গবেষণা করছেন স্কট ক্রিল। ৫০টির বেশি দলের ৫০০টির বেশি কুকুরের গলায় জিপিএস কলার লাগিয়ে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
যাত্রা শুরুর এক মাসের মধ্যেই কুকুর তিনটি কয়েক শ মাইল পথ পাড়ি দেয়। তারা জাম্বিয়ার বড় শহরগুলোর কাছাকাছি পৌঁছালেও শহরের ভেতরে না ঢুকে বারবার ফিরে আসে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছেড়ে লোকালয়ের কাছাকাছি আসার পর তাদের চলাফেরায় পরিবর্তন দেখা যায়। বিশ্রাম নেওয়া, খাবার খোঁজা ও চলাচলের স্বাভাবিক ছন্দ বাদ দিয়ে তারা দ্রুত একদিকে এগোতে থাকে। গবেষক ক্রিল এ আচরণকে বলেছেন ‘ট্রাভেল মোড’ বা যাত্রার বিশেষ ধরন।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরে তিন পুরুষ কুকুরের সঙ্গে তাদের চার বোন মেয়ে কুকুরের দেখা হয়। এর মধ্যে মেয়ে কুকুরের একজন মারা যায়। গন্ধ শুঁকে এত দূর থেকে একে অপরকে খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি প্রাণীগুলোর বিশেষ ঘ্রাণশক্তির প্রমাণ।
এরপর আরও ছয় মাস পথ পাড়ি দিয়ে তিন ভাই পৌঁছায় পূর্ব জাম্বিয়ার লুয়াংওয়া উপত্যকায়। সেখানে আফ্রিকান বন্য কুকুরের বড় একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে। গবেষক ক্রিলের ধারণা, সেখানে তারা স্ত্রী কুকুরের সন্ধান পেয়েছে। তবে দুর্গম এলাকা হওয়ায় বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এ দীর্ঘ যাত্রা শুধু তিন কুকুরের সঙ্গী খোঁজার গল্প নয়। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বন্য কুকুরের এমন চলাচলের ফলে জাম্বিয়ার সাতটি জাতীয় উদ্যানের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। এমনকি কিছু কুকুর মোজাম্বিক, মালাউই ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রেও পৌঁছেছে।
ক্রিলের মতে, বন্য কুকুরের সংখ্যা বাড়াতে হলে তাদের বিভিন্ন দলের মধ্যে যোগাযোগ থাকা জরুরি। তিনি বলেন, তাদের সংখ্যা বাড়বে কেবল তখনই, যখন তারা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবে।
ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে বন্য কুকুর
এই আশাব্যঞ্জক গল্পের পেছনে রয়েছে ভয়াবহ বাস্তবতা। ভাইদের সঙ্গে দেখা হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর কুকুরগুলোর তিন বোনের একজন বনের মধ্যে শিকারের ফাঁদে আটকা পড়ে। তারের তৈরি এসব ফাঁদ মূলত হরিণ বা জেব্রার মতো বড় প্রাণী শিকারের জন্য পেতে রাখেন চোরাশিকারিরা। কিন্তু এতে বন্য কুকুরসহ অন্য প্রাণীরাও আটকা পড়ে।
ফাঁদে আটকে গুরুতর আহত হওয়ার পর বোনটিকে ছেড়ে যায়নি অন্য দুই কুকুর। জিপিএসের তথ্য থেকে গবেষকেরা দেখতে পান, তারা বারবার আহত বোনটির কাছে ফিরে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে তাদের একজনেরও চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থলে একটি জিপিএস কলার পাওয়া যায়। গবেষকদের ধারণা, সে-ও ফাঁদে পড়ে মারা গেছে। অন্য বোনটির পরিণতি এখনো অজানা।
স্কট ক্রিলের মতে, চোরাশিকার শুধু বন্য কুকুরের জীবনই বিপন্ন করছে না, তাদের খাবারের উৎসও কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে খাবারের সন্ধানে তাদের আরও দূরে যেতে হচ্ছে। এতে ফাঁদে আটকা পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন ক্রিল। তাঁর ভাষায়, মানুষ শখ করে ফাঁদ পাতে না। দীর্ঘ মাটির রাস্তার শেষ প্রান্তে বসবাস করা দরিদ্র মানুষ জীবিকার অন্য সুযোগ না পেয়ে এমন কাজ করেন। তাই এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাঁদের ফাঁদ পাতার প্রয়োজনই না হয়।
মানুষের তৈরি পৃথিবীতে অন্য প্রাণীদের টিকে থাকার লড়াই যে কত কঠিন, তা এই তিন বন্য কুকুরের যাত্রা আবারও মনে করিয়ে দেয়। ক্রিল বলেন, ‘পৃথিবীতে আমরা ৮৩০ কোটি মানুষ বাস করি। কিন্তু আমাদের সঙ্গে আরও প্রায় ৮০ লাখ প্রজাতির প্রাণীও এই পৃথিবীকে ভাগ করে নিচ্ছে। তাদের টিকে থাকা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।’