
ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ॥ ইসলামী হিজরি বর্ষের দ্বিতীয় মাসের নাম সফর। আরবি ক্যালেন্ডারের এই মাসকে ঘিরে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সমাজে নানা ধরনের ধারণা প্রচলিত ছিল। বিশেষ করে ইসলামপূর্ব যুগে আরবরা সফর মাসকে অশুভ মনে করত। তারা বিশ্বাস করত, এ মাসে বিপদ-আপদ বেশি আসে, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিবাহ বা নতুন কোনো কাজ শুরু করলে অমঙ্গল ঘটে। ইসলাম আগমনের পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এসব ভ্রান্ত বিশ্বাস দূর করে মানুষকে সঠিক আকিদা শিক্ষা দেন। তিনি জানিয়ে দেন, কোনো মাস, দিন বা সময় নিজের ক্ষমতায় কল্যাণ বা অকল্যাণ আনতে পারে না। সবকিছুই একমাত্র মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের অধীন। সুতরাং সফর মাস কোনো অশুভ মাস নয়; বরং এটি আল্লাহর নির্ধারিত বারো মাসের একটি সাধারণ মাস, যেখানে একজন মুসলিম অন্যান্য মাসের মতোই ইবাদত, নেক আমল ও আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে জীবনকে সুন্দর করতে পারে।
সফর মাসের পরিচয় ও নামকরণের ইতিহাস: সফর শব্দটি আরবি ‘সিফর’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ খালি বা শূন্য। ঐতিহাসিকভাবে বলা হয়, ইসলামপূর্ব আরবদের অনেক মানুষ এ সময় যুদ্ধ, ব্যবসা ও বিভিন্ন কাজে ঘর থেকে বের হয়ে যেত, ফলে তাদের ঘরবাড়ি অনেক সময় খালি থাকত। এর মধ্যে সফর মাস দ্বিতীয় মাস হিসেবে পরিচিত।
কুরআনের আলোকে মাসগুলোর মর্যাদা: আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি, যেদিন থেকে তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। (সূরা আত-তাওবা: ৩৬)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সময় ও মাস আল্লাহর সৃষ্টি। কোনো মাসকে নিজের পক্ষ থেকে অশুভ বা ভয়ের কারণ মনে করা ইসলামের শিক্ষা নয়। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো কষ্ট দেন, তবে তিনি ছাড়া কেউ তা দূর করতে পারে না। আর যদি তিনি তোমার কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহ প্রতিহত করার কেউ নেই। (সূরা ইউনুস: ১০৭)। এই আয়াত মুসলিমকে শিক্ষা দেয় যে, লাভ-ক্ষতি, বিপদ-আপদ সবকিছু আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। কোনো মাস বা সময় মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বাধীন ক্ষমতা রাখে না।
হাদিসের আলোকে সফর মাসের ধারণা: রাসূলুল্লাহ (সা.) জাহেলি যুগের কুসংস্কার দূর করতে বলেছেন, সংক্রমণ রোগ নিজস্ব ক্ষমতায় ছড়ায় না, অশুভ লক্ষণ বলে কিছু নেই, সফর মাস অশুভ নয় এবং পেঁচার ডাক সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ভিত্তিহীন। (সহিহ বুখারি: ৫৭৫৭, সহিহ মুসলিম: ২২২০)। এই হাদিসে রাসূল (সা.) স্পষ্ট করেছেন যে সফর মাসকে অমঙ্গলজনক মনে করা ইসলামী বিশ্বাস নয়। আরেক হাদিসে এসেছে: যে ব্যক্তি কুসংস্কারের কারণে কোনো কাজ থেকে ফিরে যায়, সে তাওহীদের পরিপন্থী কাজ করে। (মুসনাদ আহমাদ)। অর্থাৎ একজন মুমিনের বিশ্বাস হবে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া পৃথিবীতে কিছুই ঘটে না।
সফর মাসকে অশুভ মনে করা কেন ভুল? ইসলামের পূর্বে আরবদের মধ্যে ‘অশুভ লক্ষণ’ বা কুসংস্কারের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তারা কোনো পাখির ডাক, কোনো দিন বা মাসকে অমঙ্গলের কারণ মনে করত। ইসলাম এসে মানুষকে জানিয়েছে, কোনো দিন নিজে অশুভ নয়। কোনো মাস নিজে বিপদের কারণ নয়। আল্লাহর ওপর বিশ্বাসই প্রকৃত নিরাপত্তা। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় নয়, বরং আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। মুসলিমের হৃদয়ে এই বিশ্বাস থাকতে হবে যে, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন সেটিই বান্দার জন্য সর্বোত্তম।
সফর মাসে বিশেষ কোনো ইবাদত আছে কি? কুরআন ও সহিহ হাদিসে সফর মাসের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ নামাজ, বিশেষ রোজা, নির্দিষ্ট দোয়া বা বিশেষ অনুষ্ঠান পালনের নির্দেশ নেই। তবে একজন মুসলিম এ মাসে অন্যান্য মাসের মতো সাধারণ নেক আমল করতে পারে : পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা। বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা। আল্লাহর জিকির করা। তাওবা ও ইস্তিগফার করা। দান-সদকা করা। মানুষের উপকার করা। সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য প্রতিটি সময়ই গুরুত্বপূর্ণ।
সফর মাসে প্রচলিত ভুল প্রথা : অনেক অঞ্চলে এখনো কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, যেমন: সফর মাসে বিয়ে করা যাবে না। নতুন ব্যবসা শুরু করা যাবে না। সফরে বের হওয়া অমঙ্গল। মাসের নির্দিষ্ট দিনে বিপদ বেশি আসে। বিশেষ কিছু অনুষ্ঠান করলে বিপদ দূর হবে। এসব বিশ্বাসের পক্ষে কুরআন ও সহিহ হাদিসে কোনো প্রমাণ নেই। বরং এগুলো মানুষের তৈরি ধারণা। ইসলাম মানুষকে যুক্তি, জ্ঞান ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের শিক্ষা দেয়।
ইসলামের ইতিহাসে সফর মাস: সফর মাস ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এ মাসে বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে।
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মুসলিমরা সফর মাসে বিভিন্ন সফর, দাওয়াতি কার্যক্রম ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেছেন। তারা কখনো এই মাসকে অশুভ মনে করেননি।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবনের শেষ সময়েও সফর মাসের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। একাদশ হিজরির সফর মাসের শেষ দিকে তিনি অসুস্থ হন এবং পরবর্তী মাস রবিউল আউয়ালে ইন্তিকাল করেন। এগুলো প্রমাণ করে, সফর মাস ইসলামের ইতিহাসের অংশ; এটি কোনো অমঙ্গলের প্রতীক নয়।
সফর মাসে একজন মুসলিমের করণীয়: একজন ঈমানদারের উচিত, ১. বিশুদ্ধ বিশ্বাস রাখা, আল্লাহ ছাড়া কেউ লাভ বা ক্ষতি করার মালিক নয়, এই বিশ্বাস দৃঢ় করতে হবে। ২. কুসংস্কার পরিহার করা : যে কোনো ভিত্তিহীন ধারণা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে। ৩. নেক আমল বৃদ্ধি করা: নামাজ, কুরআন, দোয়া ও মানুষের সেবা বাড়াতে হবে। ৪. আল্লাহর ওপর ভরসা করা: জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে।