শরীয়ত; তরিকত ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মানবদেহ গঠনের উপাদান

॥ পীরজাদা মাওলানা শাহ মো: হাছান উদ্দীন ॥

              মহান আল্লাহপাক রাব্বুুল আলামিন প্রায় আঠারো হাজার মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন তারমধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো ইনসান তথা মানুষ। সকল সৃষ্টি আল্লাহপাকের এক একটি কুদরত। সৃষ্টির মাঝে আল্লাহ তায়ালার পরিচয় বিরাজমান।

              সকল সৃষ্টির মাঝে মানুষ হলো সর্বোৎকৃষ্ট, কারণ মানুষকে আল্লাহপাক সুনিপুণ আকৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি -বিবেচনা এবং হেকমত দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আর কেয়ামতের মাঠে মানব ও জিন জাতীর একমাত্র হিসাব হবে বাকী সব সৃষ্টি মাটির সাথে মিশে যাবে। তার অন্যতম কারণ হলো আল্লাহপাক মানব ও জীন জাতীকে জ্ঞান, বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তাই তারা তাদের জ্ঞান, বুদ্ধি-বিবেচনাকে কোন কাজে ব্যয় করেছে তার হিসাব কিয়ামতের দিন দিতে হবে।

              এখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসতে পারে এই মানব সভ্যতাকে আল্লাহপাক দৈহিক কাঠামোকে কিভাবে সৃষ্টি করেছেন?  চলুন আমরা এই প্রশ্নের জবাব কোরআন, হাদিস, তরিকত ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে জানবো-

প্রথম  কথা হলো আল্লাহপাক সকল সৃষ্টিকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন সুতরাং আদম আ. কেও পানি হতে সৃষ্টি করেছেন, যেমন আল্লাহপাক সূরা আম্বিয়ার আয়াত নং ৩০ এ উল্লেখ করেন, কাফেররা কি ভেবে দেখেনা যে, আকাশমন্ডলি ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিলো অতপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি হতে সৃষ্টি করলাম, এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না?

              সূরা ছোয়াদ আয়াত নং ৭১ আল্লাহপাক বলেন, যখন আপনার পালনকর্তা  ফেরেস্তাগণকে বললেন, আমি মাটির মানুষ তৈরি করব। সূরা মু’মিনুন আয়াত নং ১২ এ আল্লাহপাক বলেন, আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি।

সূরা আল হিজর আয়াত নং ২৯ এ আল্লাহপাক বলেন, অতপর যখন তাকে ঠিকঠাক করে নিব এবং তাতে আমার রুহ ফুক দেব তখন তোমরা তার সামনে সেজদায় পড়ে যেয়ো।

              উপরোল্লি­খিত আয়াতসমূহ আদম আ. কে সৃষ্টির ব্যাপারে নাযিল হয়। অতএব আমরা একাধিক আয়াতের সারসংক্ষেপ থেকে এ কথায় এসে উপনীত হয়েছি যে, আদম আ.কে আল্লাহপাক মাটি ও পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন।

              এখন আমরা জানবো মা হাওয়া আ. কে কি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন- বোখারি শরীফের ৩৩৩১ নং হাদিস এবং মুসলিম শরীফের ১৪৬৮ নং হাদিসটি মা হাওয়া আ. এর সৃষ্টির উপাদান সম্পর্কে  বিষদ বর্ণনা এসেছে। হাদিসটি হলো- হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্নিত- রাসূল সা. বলেছেন তোমরা নারীদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করো। কারণ নারীদেরকে পাজরের বাঁকা হাড় দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। পাজরের হাড়ের মধ্যে উপরের অংশটি সবচেয়ে বেশি বাঁকা। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও তবে তা ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি নিজের অবস্থায় ছেড়ে দাও তবে তা বাঁকাই থেকে যাবে। কাজেই নারীদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করো।

              উপরোক্ত হাদিস দ্বারা মা হাওয়া আ. কে সৃষ্টির উপাদান তথা কোমরের বাঁকা হাড়ের কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।

এখন আমরা আদম সন্তানদের সৃষ্টির উপাদান আলোচনা করব। পবিত্র কোরআনে মানব সৃষ্টির উৎস হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় বির্য ও শুক্রাণুর (আরবি নুতফাহ) উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সূরা ইনসান ২ নং আয়াতে আল্লাহপাক বলেন, আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে তাকে পরীক্ষা করার জন্য। অতপর আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন।

              সূরা আল হজ্জ ৫ নং আয়াতে আল্লাহপাক উল্লেখ করেন, হে মানব মন্ডলি! যদি তোমরা পুনরুত্থান  সম্পর্কে সন্দিহান হও তবে (ভেবে দেখ) আমিতো তোমাদেরকে মৃত্তিকা থেকে অতপর শুক্রানু থেকে, অতপর রক্তপিন্ড  থেকে, অতপর পূর্ণাকৃতি বা অপূর্ণাকৃতি মাংসপিন্ড থেকে সৃষ্টি করেছি তোমাদের কাছে (আমার সৃষ্টির ক্ষমতা) স্পষ্ট করার জন্য।

              সূরা ইয়াসিনের ৭৭ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- মানুষ কি দেখেনা যে, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি বির্য থেকে? অথচ তখনই সে প্রকাশ্য বাকবিতন্ডাকারী হয়ে উঠে।

              সূরা তারিকের ৫-৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, অতএব মানুষের উচিৎ ভেবে দেখা সে কি থেকে সৃষ্টি হয়েছে। সে সৃষ্টি হয়েছে সবেগে স্খলিত তরল (বির্য)  থেকে, যা নির্গত হয় মেরুদন্ড ও বক্ষপিঞ্জরের মাঝখান থেকে।

              অতএব উপরোল্লেখিত আয়াতে কারিমাগুলো থেকে একথা স্পষ্ট হলো যে, আদম সন্তানগণকে নুতফা তথা বির্য থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

              এখন আমরা তরীকতের দৃষ্টিকোণ থেকে মানবদেহ গঠনের উপাদান সম্পর্কে জানবো।

              তরীকতের দৃষ্টিকোণ থেকে মানবদেহ গঠনের উপাদান মূলত ৫টি।

১। আব তথা পানি: শরীরের তরল অংশ যেমন- রক্ত, ঘাম এবং শরীরের  অন্যান্য শারীরিক রস

২। আতস তথা অগ্নি/ আগুন: শরীরের তাপ এবং বিপাকীয় ক্রিয়ার জন্য দায়ী। যেমন হজম এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ।

৩। খাক তথা মাটি: শরীরের কঠিন অংশ যেমন- হাড়, পেশি এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।

৪। বাদ তথা বায়ু/ বাতাশ: শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শরীরের বায়ু সঞ্চালনের সাথে সম্পর্কিত।

৫। নফস তথা আতœা/ মন: ইসলামি পরিভাষায় এটি মানুষের ভিতরের সেই প্রবৃত্তি  বা শক্তিকে বুঝায় যা ভালো ও মন্দের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে।

              তথ্যসূত্র: এই ধারণাগুলো মূলত সূফী সাধনার অংশ এবং আধ্যাতিœক দর্শনের উপর ভিত্তি করে তৈরি।

              এখন আমরা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মানব দেহ গঠনের উপাদান সম্পর্কে জানবো।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে মতভেদসহ মানবদেহের উপাদান প্রধানত ৬টি।

১। অক্সিজেন (০) প্রায় ৬৫%, ২। কার্বন (প) ৩। হাইড্রোজেন (য) ৪। নাইট্রোজেন

৫। ক্যালসিয়াম (পধ) ৬। ফসফরাস (ঢ়)

              এছাড়াও পটাসিয়াম (শ), সালফার (ং), সোডিয়াম (হধ), কোরিন (পর), ম্যাগনেসিয়াম (সম) রয়েছে।

তথ্যসূত্র: ১। এনাটমি বা শরীরবিদ্যা ২। ফিজিওলজি বা শরীর বিজ্ঞান।

              লেখক: কলামিস্ট, সুবক্তা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক ও আশেকে রাসূল ( সা.)

পরিচালক: তিলিপ দরবার শরীফ গনীয়া-মুঈনীয়া কমপ্লেক্স, নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা

মোবাইল: ০১৭৫৬৯৩৭১৬৯

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বদেশ রেস্তোরাঁ এন্ড পাটি সেন্টার