👁 316 Views

জীবন থেকে হারিয়ে গেল আরো একটি বছর

\ ড. ইউসুফ খান \

            ভাবতেই অবাক লাগে, সময়ের ঝড়ো হাওয়ায় চোখের নিমেষে ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো কীভাবে উল্টে যাচ্ছে। সময় যেন এক প্রবহমান মহাসমুদ্র। কালের গর্ভে হারিয়ে গেল আরো একটি বছর। এভাবেই হারিয়ে যেতে থাকবে সময়গুলো, সঙ্গে হারিয়ে যাবে কত সুমধুর স্মৃতি, কত ভালো লাগার মুহূর্ত। কত আপনজনদের প্রিয়মুখ। স্মৃতি কেন এত ব্যথা দেয়, কেন ভিতরে ভিতরে রক্তক্ষরণ হতে থাকে? নতুন বছরেও হয়তো আরও অনেক স্মৃতি জমা হবে। কামনা করি, স্মৃতিগুলো আনন্দময় হয়ে উঠুক।

            দিন গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর, বছর গড়িয়ে দশক। মেঘে মেঘে বেলা তো আর কম হলো না! সময়ের আবর্তে আমার চিন্তা-চেতনায়, জীবন-যাপনে পরিবর্তনের ছোঁয়া  লেগেছে। চেহারা বদলে গেছে। চঞ্চলতা হারিয়ে গেছে। কারণে-অকারণে হাসতেও ভুলে গেছি। চুলে পাক ধরেছে। মুখে বয়সের বলিরেখা পড়েছে। ব্যক্তিত্ব শানিত হয়েছে বটে কিন্তু ঘুম হারিয়ে গেছে। লুকানোর কিছু নেই। আমি যা আমি তাই। আসলে সময়গুলো বড্ড স্বার্থপর। চলে যাওয়ার পথে হৃদয়ে আঁচড় কেটে যায়। কেড়ে নেয় আবেগমথিত ভালোবাসাগুলোও। যে মানুষটা সবচেয়ে আপন ছিল, সেও কেমন যেন অপরিচিত হয়ে গেছে। যে ভাবতে শিখিয়েছিল আমি তার সবচেয়ে আপনজন, সময়ের আবর্তনে সে মানুষটাও কেমন বদলে গেছে। হয়তো এটাই রীতি।

            মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কগুলো আসলেই স্বর্গীয়। চেনা নেই, জানা নেই  চলার পথে পরিচয়। তারপরও আমরা সম্পর্কে জড়িয়ে যাই। বেলা অবেলায় কেটে যায় জীবন। এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে একদিন সবাইকে বিদায় নিতে হবে। কেউ একজন চলে গেলে কারোরই কিছু যাবে আসবে না। কারণ সব মৃত্যু মানুষকে সমানভাবে কাঁদায় না, ভাবায় না। সব মৃত্যুর ক্ষতিও সমান নয় পৃথিবীর কাছে। কিন্তু তারপরও এমন কিছু স্মৃতি থাকে যা একান্ত সঙ্গোপনে নাড়া দিয়ে যায়। নিবিড় বেদনায় মন আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। গভীর রাতে হৃদয়কে আন্দোলিত করে।

            জীবন বড়ই অনিশ্চিত, ক্ষণস্থায়ী। আর এটা জেনেও একে ঘিরে আমাদের কতই না আয়োজন। ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত যা কিছুই করি, সবই তো এই জীবনের জন্য। একবার ভাবুন তো এই জীবনটাকে ভালোভাবে উপলব্ধি বা বুঝে ওঠার আগেই যদি পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়, তাহলে কতই না আফসোস থাকবে? মনে করুন, ভয়ংকর এক ভূমিকম্পে পৃথিবীর সব বাড়িঘর ধূলিসাৎ হয়ে গেল কিংবা প্রবল এক সুনামিতে পুরো পৃথিবী চলে গেল জলের তলায় কিংবা পৃথিবীতে ফিরে এলো তুষার যুগ। পুরো পৃথিবী ঢাকা পড়ে গেল বরফের তলায়। সেই ভয়ংকর মুহূর্তে মানুষ কি বাঁচবে?  তখন কি হবে এই পৃথিবীর সভ্যতার?

            প্রতিদিন আয়নায় মুখ দেখি। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় নিজের ছবি বন্দি করি। সিসিটিভি ক্যামেরার ভিতর বসবাস করি। তারপরও নিজেকে হারিয়ে ফেলি। আসলে আমাদের জীবনটা বড়ই অদ্ভুত। যা কখনো ভাবিনি, যা কখনো প্রত্যাশা করিনি তাই ঘটেছে। সামান্য মানুষ তা সত্তে¡ও এ ক্ষদ্র জীবনে এত ভালোবাসা পাব বুঝিনি। অনেক পেয়েছি বিনিময়ে কিছুই দিতে পারিনি। হয়তো পারবও না। শূন্য হাতেই চলে যেতে হবে। আকস্মিক এসেছি আকস্মিকই চলে যাব। জীবন বড়ই রহস্যময়। মানুষের ভাবনাগুলো আরও রহস্যময়।

            মানুষমাত্রই স্মৃতিকাতর। স্মৃতিরোমন্থন করতে কার ভালো না লাগে! আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আমার কিন্তু ঘুরেফিরে শৈশব-কৈশোরের কথাই বেশি মনে পড়ে। ওই দিনগুলো আমাকে সবচেয়ে বেশি তাড়িয়ে বেড়ায়, আবেগমথিত করে। মনে আছে ছোটবেলায় যখন টিনের ঘরে থাকতাম বৃষ্টি পড়লে কী ভালোই না লাগত। ঝুম বৃষ্টিতে একটা ঐক্যতান সৃষ্টি হতো। শরীর ও মনে শীতল পরশ বয়ে যেত। স্মৃতি বড়ই এক অদ্ভুত জিনিস। অনেক সময় বড় ঘটনাগুলোও আমরা ভুলে যাই। মনে দাগ কাটে না। আবার সামান্য ঘটনাও মনের মধ্যে রয়ে যায়। অনেক ছোট ছোট তুচ্ছ ঘটনাও মনের স্মৃতিকোঠায় জ্বলজ্বল করতে থাকে। চোখ বন্ধ করলেই যেন একটার পর একটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

            ছোটবেলায় যখন থেকে গল্পের বই পড়া শুরু করি তখন থেকেই মনের মধ্যে নানা রকম স্বপ্ন বাসা বাঁধতে থাকে। যখন যেটা পড়তাম সেটাই মনের মধ্যে গেঁথে থাকত। লুকানো বাসনাগুলো মাঝেমধ্যেই প্রবলভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠত। এক জীবনে কত কিছুই না হতে চেয়েছি তার কোনো ঠিকঠিকানা নাই! ইচ্ছাগুলো কিছুদিন ডালপালা বিস্তার করে আবার নিভে যেত। তখন নতুন করে ভাবনা শুরু হতো। ওই বয়সে গল্পের বই পড়ার জন্য কতই না বকা খেয়েছি। তাই তো লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তে হতো।

            কলকাতার অভিনেতা, লেখক ও পুলিশ অফিসার ধীরাজ ভট্টাচার্যের জীবনে ঘটে যাওয়া অ্যাডভেঞ্চার ও অধরা রোমাঞ্চকর প্রেমাখ্যান আমার অবচেতন মনে এক গভীর ছাপ ফেলে দেয়। আর তখন থেকেই পুলিশ অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। পুলিশের প্রতি শ্রদ্ধাটা তৈরি হয় মুক্তিযুদ্ধের সময়। রাজারবাগে পুলিশের যে বীরোচিত ভূমিকা রাখার কথা জেনেছি তাতে শ্রদ্ধাটা আরও বেড়ে যায়। করোনাকালেও পত্রপত্রিকায় দেখেছি, অনেক পুলিশ সদস্যই তাঁদের দাপ্তরিক দায়িত্ব প্রতিপালনের পাশাপাশি মানবিক কাজ করে প্রসংশা কুড়িয়েছেন। কিন্তু যখন কোনো পুলিশ সদস্যের বড় ধরনের স্খলনের কথা সামনে আসে তখন খুব কষ্ট পাই। প্রতিটি মানুষের এগিয়ে চলার গল্প ভিন্ন, সংগ্রামবহুল। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। চলার পথে কতবার হোঁচট খেয়ে যে মুখ থুবড়ে পড়েছি তার হিসাব নেই। দিন শেষে জীবনসংগ্রামে কতটুকু জয়ী হতে পেরেছি জানি না। তবে এতটুকু বুঝতে পারছি যে জীবনকে সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে হলে আর্থিক স্বাধীনতার বিকল্প নেই।

            অতীত আছে বলেই বর্তমান অর্থবহ। প্রতিটি সময় সেকেন্ডের কাঁটা ঘুরে মুহূর্তেই স্থান করে নেয় অতীত। আর সেই সময়গুলো আমাদের কাছে ধরা দেয় স্মৃতির ভিড়ে। তাই তো যখনই মন খারাপ হয়, সেই হারানো স্মৃতি, সোনালি অতীত হাতড়ে বেড়াই, আর তখন মন ভালো হয়ে যায়। মানুষ তো প্রকৃতিরই সন্তান। যেকোনো মানুষের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটা বড় অবদান থাকে তার জন্মস্থান ও পারিপার্শ্বিকতার। আমার জীবনেও আমার জন্মস্থানের একটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। আমাকে বেঁধে রেখেছে সারা জীবনের ঋণে। আর তাই তো আমার একান্তের নিভৃত মনে প্রায়শই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে আমার প্রাণপ্রিয় জন্মস্থান। নানা অঘটন থেকে নিজেকে দূরে রাখার একটা ক্ষুদ্র প্রয়াস হলো লেখালেখির মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখা। শুনেছি যারা লেখালেখি করেন দুঃখ-কষ্ট-হতাশা তাদের অত সহজে কাবু করতে পারে না।

            এই অখন্ড অবসরে লেখালেখি করে সময় কাটাই বটে তবে এটাও জানি যে একজন সত্যিকারের লেখক হতে গেলে যেসব গুণাবলি থাকা দরকার তা আমার নেই। যখন কোনো ভালো একটা লেখা পড়ি তখন মনে হয় আমি কত তুচ্ছ, কত সাধারণ। তখন নিজেই নিজের কাছে লজ্জা পাই। তবে এটাও ঠিক যে আমি যা কিছু লেখি, যা কিছু করি, নিজের আনন্দের জন্য করি। অন্যকে ইমপ্রেস করার মতো কোনো যোগ্যতাও আমার নেই। তাই তো কবি বলেছেন, ‘সব ফুল কি আর ফোটে?  কিছু কিছু ফুল ফোটার আগেই ঝরে যায়।’

            যতটা না সুখ তার চেয়ে বেশি দুঃখ মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে। কেউ দুঃখ চায় না, সবাই চায় সুখী হতে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে মানুষ যেটা বেশি চায় সেটা পায় না। অনেক তুচ্ছ কারণেও সে দুঃখী হতে পারে। আসলে দুঃখ একটা বোধের নাম। কেউ দুঃখকে সামলে নিতে পারে,  কেউ পারে না। আমি নিজেও দুঃখকে সামলে নিতে পারি না। দুঃখ আমাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়। সামান্য কারণেও আমি দুঃখ পাই, ব্যথিত হই। হয়তো এটাই আমার নিয়তি। যে জীবন মানুষদের তা পাখিদের নয়। আবার যে জীবন পাখিদের তা গাছদের নয়। তবু সবই তো জীবন। ভিন্ন স্বাদ, ভিন্ন রং, ভিন্ন রূপ, প্রেম আর ভালোবাসায় গর্বিত জীবন। লেখকঃ গবেষক ও প্রাবন্ধিক

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *