বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নতুন বছরে নতুন বাংলাদেশ

নতুন বছরে নতুন বাংলাদেশ
২৮ Views

            জ্যাস্টিন গোমেজ\ নতুন বছর ২০২৬-এ পর্দাপণ কেবল একটি তারিখের বদল নয়। এটি সময়ের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি নীরব প্রশ্ন আমরা কোথায় আছি, আর কোন পথে যেতে চাই। প্রতিটি নতুন বছরের শুরুতে মানুষ শুধু ক্যালেন্ডার নয়; নিজের মনও উল্টে দেখে। ব্যক্তিগত জীবনের মতোই একটি দেশও এই সময়টিতে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। ভুল, ব্যর্থতা সবকিছু নিয়েই তাকে সামনে তাকাতে হয়। তাই নতুন বছরের শুরুতে, আমরা সবাই এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াই, হয়তো নিজের জীবনের হিসাব নিতে, হয়তো দেশের ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে। কেননা, প্রতিটি বছর আসে নতুন আশা, নতুন কিছু দায়িত্ব নিয়ে। ২০২৬-এর পথে আমরা এগোচ্ছি শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানোর জন্য নয়; আমরা এগোচ্ছি নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে, যেখানে থাকবে স্বপ্ন আর থাকবে মর্যাদা। আর সেই সমান মর্যাদা পাবে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষও।

            বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে রয়েছে রাজনৈতিক টানাপোড়ন, অর্থনৈতিক চাপে নুয়ে পড়া সাধারণ জীবন, সামাজিক বিভাজন আর বৈশ্বিক অস্থিরতার ছায়া। তবুও মানুষ নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। কারণ মানুষ জানে আশা ছাড়া বেঁচে থাকা যায় না। আগামী ১২ই ফেব্রæয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের জন্য শুধু একটি নির্বাচন নয়; বরং গণতন্ত্রের একটি প্রকৃত পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। ২০২৫ সালের ৫ই আগস্টে সরকার পতনের পর দেশের রাজনীতি একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে জনগণের প্রত্যাশা আরও গভীর। এই নির্বাচন যদি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভূুক্তিমূলকভাবে অনুষ্ঠিত হয়, সব রাজনৈতিক দল, মত ও পরিচয়ের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, তবে সেটিই হবে গণতন্ত্রের প্রতি রাষ্ট্রের আন্তরিকতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বিশেষ করে জুলাইয়ের আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, সেই শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ যেন কেবল স্মৃতিফলকে সীমাবদ্ধ না থাকে; রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে তাদের অবদানও স্মরণ করা জরুরি। একই সঙ্গে আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থীরা যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সহায়তা পায়, এটি হবে রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব। জুলাইয়ের সেই গণআন্দোলন ও তার আদর্শকে যথাযথ মর্যাদা দেয়া মানেই হলো গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে সম্মান করা। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত দেশের কাঠামোগত সংস্কার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং বিভাজনের রাজনীতির বদলে আস্থার রাজনীতি গড়ে তোলা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পর ফল যাই হোক না কেন, সব পক্ষ যেন গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়ে তা মেনে নেয়। কারণ, এই নির্বাচনেই বাংলাদেশ প্রমাণ করতে পারে গণতন্ত্র এখানে কেবল একটি অতীত স্মৃতি নয়; বরং ভবিষ্যতের পথচিহ্ন।

            দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আদতে খুব বড় কিছু নয়; তবুও তা বহুদিন ধরেই অধরা রয়ে গেছে। মানুষ চায় এমন একটি জীবন, যেখানে নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হবে। তারা চায় সম্মানজনক কাজ, যেখানে পরিশ্রমের মূল্য অবহেলা নয়, মর্যাদার সঙ্গে স্বীকৃত হবে। চায় ন্যায্য দাম, পণ্যের বাজারে যেমন, তেমনি জীবনের প্রতিটি স্তরে। মানুষ চায় নিজের কথা বলার অধিকার, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের জন্য যেন ভয়কে সঙ্গী করতে না হয়। একজন মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না, তিনি প্রতিদিন প্রার্থনা করেন তার সন্তান যেন নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে, পথে কিংবা শ্রেণিকক্ষে কোনো অদৃশ্য শঙ্কার মুখোমুখি না হয়। একজন শ্রমিক দিনের পর দিন ঘাম ঝরিয়ে শুধু বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা চান, সারা দিনের খাটুনির শেষে ন্যায্য মজুরি, পরিবার নিয়ে মাথা গোঁজার মতো আশ্রয় এবং আগামীকাল নিয়ে অন্তত কিছুটা ভরসা। একজন সংখ্যালঘু নাগরিক চান, তাঁর ধর্মীয় পরিচয় যেন তাকে সমাজে দুর্বল বা সন্দেহভাজন করে না তোলে। যেন তিনি নাগরিক হিসেবে সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা পান। আর একজন তরুণ, যার চোখে স্বপ্ন আর মনে সম্ভাবনার আগুন, সে চায় স্বপ্ন দেখাকে যেন অপরাধ হিসেবে দেখা না হয়। চায় এই দেশেই নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করার সাহস ও সুযোগ। আর এই প্রত্যাশাগুলো কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়েও গভীর। এগুলো মানবিক প্রত্যাশা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যখন রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা ক্ষমতার কাঠামো এই প্রত্যাশাগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন মানুষের ভেতরে জমতে থাকে নীরব হতাশা। এই হতাশা একসময় রূপ নেয় ক্ষোভে, কখনো উদাসীনতায়, কখনো দেশ ছাড়ার আকাঙ্খায়।

            এছাড়াও বিশ্ব আজ গভীরভাবে যুুদ্ধ ও ক্ষুধায় ক্লান্ত। একটি অবসন্ন পৃথিবী যেন অবিরাম দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। যুদ্ধ, সহিংসতা, উদ্বাস্তু সংকট, জলবায়ু বিপর্যয় এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য মিলিয়ে মানবসভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে এক অস্বস্তিকর মোড়ে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের গোলার শব্দ, ইসরাইল-গাজা সংঘাতে বিধ্বস্ত জনপদের আর্তনাদ, সুদান কিংবা মিয়ানমারের অস্থিরতায় ভিটেমাটি হারানো মানুষের হাহাকার- প্রতিটি সংকটের গভীরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য ট্র্যাজেডি, অগণিত স্বপ্নের ভাঙন। বিশ্ব রাজনীতি যখন ক্ষমতা, আধিপত্য আর সামরিক শক্তির ভাষায় কথা বলে, তখন হারিয়ে যায় মানবতা। বিশ্বের এই তবিত বাস্তবতায় পোপ লিও চতুর্দশের বার্তাটি নতুন বছরের নৈতিক দিকনির্দেশ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া প্রথম পোপ হিসেবে তিনি বিশ্ববাসীকে আহŸান জানিয়েছেন দুর্বল, নিপীড়িত ও কষ্টে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তিনি বলেন, মানুষ যদি অন্যের দুঃখকে নিজের বলে অনুভব করতে শেখে, তবে পৃথিবী বদলাতে বাধ্য।

            এই বৈশ্বিক অস্থিরতার ঢেউ বাংলাদেশকেও ক্রমেই স্পর্শ করছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ছে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তরুণরা স্বপ্ন দেখলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দ্বিধা ও অনিশ্চয়তায় ভুগছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে নির্মমভাবে এসে পড়ছে এই ব-দ্বীপের মানুষের ওপর। নদীভাঙনে ঘর হারানো পরিবার, লবণাক্ততায় নষ্ট হওয়া ফসল, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় বারবার ভেঙে পড়া জীবন- সব মিলিয়ে অস্তিত্বের লড়াই দিন দিন আরও কঠিন, আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এই অনিশ্চয়তার মাঝেই নতুন বছরের প্রশ্ন আরও তীব্র হয়- আমরা কীভাবে সামনে এগুবো?

            এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতির কিছু মুহূর্ত কেবল রাজনৈতিক থাকে না, তা সামাজিক ও নৈতিক বার্তায় রূপ নেয়। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য এমনই এক মুহূর্ত সৃষ্টি করেছে। পূর্বাচলের বিশাল জনসমাবেশে তিনি যে ভাষায় কথা বলেছেন, সেখানে ক্ষমতার ভাষার চেয়ে মানুষের ভাষা বেশি শোনা গেছে। নারী-পুরুষ-শিশু, সব ধর্ম ও পেশার মানুষের নিরাপত্তার কথা, এটি আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে মৌলিক আকাঙ্খার প্রতিফলন। কারণ মানুষ এখন বড় প্রতিশ্রæতির চেয়ে ছোট নিশ্চয়তা চায়, নিরাপদে বের হওয়া, নিরাপদে ফিরে আসা। তিনি যখন বলেন, ‘আমরা দেশের শান্তি চাই,’- তখন সেটি শুধু রাজনৈতিক উচ্চারণ নয়; এটি একটি সামাজিক আকুলতা। দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, দমন-পীড়ন আর অবিশ্বাসের রাজনীতি মানুষকে ক্লান্ত করে তুলেছে। এই ক্লান্ত সমাজে শান্তির কথা বলা নিজেই একটি বার্তা। মার্টিন লুথার কিং যখন ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ বলেছিলেন, সেটি কেবল স্বপ্ন ছিল না, তা ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক বিদ্রোহ। তারেক রহমান যখন বলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি,’- তখন সেটি সেই ঐতিহ্যের দিকেই ইঙ্গিত করে, যেখানে আশা নিষ্ক্রিয় অপেক্ষা নয়; বরং সক্রিয় দায়িত্ব।

            আর তাই নতুন বছর আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়, সময় কোনো নিশ্চয়তা নয়, এটি একটি অনুগ্রহ। আজ যা আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে। ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা, অর্থ, এমনকি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাও চিরস্থায়ী নয়। আর এই উপলব্ধিই রাজনীতিতে বিনয় আনবে, সমাজে আনবে সংযম। যখন আমরা ভাবি সময় আমাদের হাতে বন্দি, তখনই ভুল করি। সময় আমাদের সুযোগ দেয়। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ইতিহাস কঠোর হয়। বাংলাদেশ আজ যে সময়টুকু পেয়েছে, তা একটি সুযোগ। আর সেটি হলো গণতন্ত্র পুনর্গঠনের, সামাজিক আস্থা ফিরিয়ে আনার, বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সবুর্ণ সুযোগ।

লেখকঃ সাংবাদিক

Share This