
ষ্টাফ রিপোর্টার\ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে সারাদেশে খুনের ঘটনায় ১ হাজার ৪৫২টি মামলা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ঘটনায় একাধিক মানুষ খুন হলেও হত্যা মামলা হয়েছে একটি। এ হিসাবে পাঁচ মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০টি খুনের মামলা হয়েছে।
একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৭ হাজার ৯১০টি, অপহরণের ৪৩৭টি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ৮৫৮টি এবং মাদক-সংক্রান্ত ২৬ হাজার ১৪১টি মামলা হয়েছে। চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৯১২টি।
আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের একই সময়ে (জানুয়ারি থেকে মে) খুনের মামলা হয়েছিল ১ হাজার ৫৮৭টি। এ পরিসংখ্যানে আগের খুনের ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল ৯ হাজার ১০০টি এবং চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা ছিল ৪ হাজার ৯৫৫টি।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ১৯৮টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে এপ্রিলে ৪৪টি ঘটনায় ২২ জন ও মে মাসে ৬৬টি ঘটনায় ৩১ জন প্রাণ হারিয়েছে।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ মাসে ৭৭২টি রাজনৈতিক সংঘাতে ৯৬ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ১ হাজার ২৬৯ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ধর্ষণের শিকার ২৯৮ জন। বিভিন্ন কারণে প্রাণ হারিয়েছে ২৫১ শিশু।
অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৮৯ জন। একই সময়ে ২৩৯ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৮৫ জনকে। ধর্ষণ-সংক্রান্ত ঘটনায় ২৬ নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ মাসে ১ হাজার ৩৫ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৫১ শিশু ও ৫৮৪ নারী। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৫০ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৮ জনকে। এছাড়া, বিভিন্ন কারণে ২৩৭ নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছেন।
আইনÑশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও বাড়ছে। গত মে মাসে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় ১৩টি স্থানে হামলার শিকার হন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), পুলিশ ও অন্য বাহিনীগুলোর সদস্যরা।
সবশেষ গত ১৬ই জুন ঢাকার আদাবরে এক বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে ৩ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় আসে। ঘটনাটি আলোচনায় আসার পর ছিনতাইকারী ধরতে মাঠে নামে পুলিশ। ওই দিনই অভিযানে গিয়ে আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলামসহ দু’জন ছিনতাইকারীদের হামলার মুখে পড়েন। ছিনতাইকারীরা তাদের কুপিয়ে আহত করে। এসময় পুলিশের গুলিতে দু’জন আহত হন। পরে জানা যায়, হামলাকারীরা ডিএমপির তালিকায় থাকা মোহাম্মদপুর-আদাবরকেন্দ্রিক কবজিকাটা আনোয়ার গ্রæপের সদস্য। ডিএমপির তালিকায়ও এই দলের বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।
এর আগে গত ২০ মে রাজধানীর পল্লবীর কালশীতে সরকারি জমি থেকে অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ অভিযানে গেলে পুলিশের ওপর হামলা হয়। পরদিন চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় ৪ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দারা ৬ ঘণ্টা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং পুলিশের একটি পিকআপভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেন।
গত ২২শে মে সিলেটে এক মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে র্যাব সদস্য ইমন আচার্য নিহত হয়। এর দু’দিন আগে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে নিহত হন পুলিশের একজন সদস্য।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক সদস্য এখনো পুরোপুরি মনোবল ফিরে পাননি। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো জটিলতায় পড়লে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমর্থন পাওয়া নিয়েও তাদের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে।
গত ১৯শে মে ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় সারাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এর দু’দিন আগে ১৭ই মে ঢাকার মুগদা থানাধীন মান্ডা এলাকা থেকে পলিথিনে মোড়ানো মাথাবিহীন মরদেহের ৭ টুকরা উদ্ধার করে পুলিশ। মোকাররম নামে ওই ব্যক্তিকে প্রেম ও আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে হত্যা করা হয় বলে প্র্রাথমিকভাবে জানতে পারে পুলিশ।
এরও আগে গত ৯ই মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আন্দালিব সাদমান রাফি নামে ৯ বছরের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, অনলাইনে জুয়ার টাকা নিয়ে শিশুটির বাবার সঙ্গে বিরোধের জেরে এ হত্যাকান্ড ঘটে। পুলিশ অভিযুক্ত নূর মুহাম্মদ খোকনের বাড়ির স্যানিটারি ল্যাট্রিনের রিং ¯ø্যাবের ভেতর থেকে বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে।
গত ৯ই মে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে শারমিন আক্তার, তার ৩ সন্তান মীম খানম, উম্মে হাবিবা ও ফারিয়া এবং রসুল মিয়াসহ পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আর্থিক লেনদেন, পরকীয়া ও পারিবারিক কলহের জেরে শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়া এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে বলে জানা যায়।
ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে গত ২৭শে ফেব্রæয়ারি রাতে মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ নামে একজনকে হত্যা করে মরদেহ ৭ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেয় তার রুমমেট শাহীন আলম। গত ১৪ই এপ্রিল রাতে যাত্রাবাড়ীর কাজলায় পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে কলেজছাত্রী মাহাদিয়া হাসান নবনী ওরফে দিয়ামনিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার মা, বোন ও ভাইও গুরুতর আহত হন। এ সময় দিয়ামনির মায়ের একটি কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশের স্থাপনা থেকে পাঁচ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮ রাউন্ড গুলি লুট হয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩২৩টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪টি গুলি উদ্ধার হয়নি।
পুলিশের লুণ্ঠিত এসব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার না হওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঝুঁকি দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য দ্রæত এসব উদ্ধার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। যদিও অন্তর্বতী সরকারের সময়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দেশব্যাপী একাধিক দফায় যৌথ অভিযান চালাতে দেখা গেছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ১১ দলের নেতাদের সমালোচনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বিগত অনেক সময়ের তুলনায় বর্তমান সময়ে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি।’
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘পুলিশের প্রতি মানুষের যে বিশ্বাস-শ্রদ্ধা ছিল তা গত ১৫ বছরে অনেক কমে গেছে। এর কিছুটা কাটিয়ে ওঠা গেছে, তবে পুরোপুরি এখনো যায়নি। আরো কিছুটা সময় লাগবে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, কিশোর গ্যাং সদস্য ও পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, টহল ও চেকপোস্ট বৃদ্ধি এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে।’
হত্যাকান্ডসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সরকার বিভিন্ন প্রতিশ্রæতি বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখাতে পারলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং তা ধরে রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।’