
নিজস্ব প্রতিনিধি\ একেবারে ছাপা অক্ষরের মতো নিজ হাতে নির্ভুলভাবে লিখেছেন পবিত্র কুরআন মাজিদ। ১১৪টি সুরা সংবলিত ৩০ পারার কুরআন মাজিদটি ছাপা না হাতে লেখা তা দেখে বোঝার উপায় নেই। ৮ মাসের চেষ্টায় ৩০ পারার কুরআন মাজিদটি হাতে লিখে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন লাকসাম উপজেলার মুদাফরগঞ্জ এ.ইউ ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার আলিম দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুরাইয়া জান্নাত। তার বাড়ি উপজেলার কান্দিরপাড় ইউনিয়নের চাদঁগাও গ্রামে। সে সৌদি প্রবাসী নুর হোসেন লিটন ও জান্নাতুল ফেরদৌস দম্পতির মেয়ে।
শিক্ষার্থী সুরাইয়া জান্নাতের (১৮) সমবয়সী মেয়েরা যখন ফেসবুকে আড্ডা দেয় কিংবা মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই সময়ে সুরাইয়া নিজের হাতে পবিত্র কুরআন লিখে অতিবাহিত করছে ব্যস্ত সময়। তার গল্প শুনলে অনেকেরই চোখ কপালে উঠবে। মাত্র ৮ মাসের চেষ্টায় নির্ভুলভাবে সে পুরো আল-কুরআন হাতে লিখেছেন। তার দৃষ্টিনন্দন হাতের লেখা দেখলে যে কারো চোখ আটকে যাবে। মনে হবে এটি কম্পিউটারে ছাপা লেখা। চোখ জুড়ানো হাতের লেখায় পবিত্র কুরআন লিখে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সে। হাতে লেখার কারণে এ কুরআন যেন আরো যতœ, ভক্তি ও আন্তরিকতায় মোড়ানো। শিক্ষার্থী সুরাইয়া আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কষ্টসাধ্য এ কাজটি করেছে।
গত বৃহস্পতিবার (২রা জুলাই) বিকালে উপজেলার কান্দিরপাড় ইউনিয়ন পরিষদের আয়োজনে শিক্ষার্থী সুরাইয়া জান্নাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা পদক ও স্মারক প্রদান করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক রাশেদা আক্তার, লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা, ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুর ইসলাম, কান্দিরপাড় উত্তর ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি হারুনুর রশীদ, দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেনসহ এলাকার নেতৃবৃন্দ।
৩০ পারা কুরআন মাজিদ হাতে লেখার ইচ্ছে কেন জাগলো জিজ্ঞাসা করলে সুরাইয়া জান্নাত বলেন, কুরআন মাজিদ হলো- মহান আল্লাহ তাআলার কালাম। যা আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর ওপর নাজিল হওয়ার মাধ্যমে আমরা পেয়েছি। এই কালামে পাক আল্লাহর রাসুলের সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত কষ্ট করে আমাদের জন্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এমন সব পবিত্র উপলব্ধি থেকে এবং অন্যদের মতো ফেসবুকে আড্ডায় অযথা সময় নষ্ট না করে ভালো কিছু করার পবিত্র মানসে সর্বোপরি মহান আল্লাহ’র রহমত এবং প্রিয় নবীজির (সা.) শাফায়াত পাওয়ার জন্য ৩০ পারা কুরআন মাজিদ অত্যন্ত সাবধনতার মাধ্যমে লেখার জন্য মনস্থির করি। কোন সময়ে লেখা হতো জিজ্ঞাসা করলে সুরাইয়া জান্নাত জানায়, মাদরাসার ক্লাস এবং নিজের পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে পবিত্র কুরআন মাজিদ স্বহস্তে লিখতাম। যাতে মাদরাসার ক্লাসের পড়াশোনার কোনো প্রকার ব্যাঘাত না ঘটে। এভাবে পুরো কুরআন মাজিদ লিখতে ৮ মাসের মতো সময় লেগেছে। সুরাইয়া জান্নাত জানায়, ২০২৫ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে শুরু করে পুরো কুরআন মাজিদ স্বহস্তে লেখা শেষ করেন আগষ্ট মাসের শেষের দিকে। কুরআন মাজিদ লিখতে কলম ব্যবহার করেছেন মোট ৫৫টির মতো। পৃষ্ঠা লেগেছে ৬১১। প্রতিবার কুরআন মাজিদ লিখতে বসার আগে অজু করতেন এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর ওপর দরূদ শরীফ পড়ে লেখা শুরু করতেন। যাতে লেখার মধ্যে বরকত পাওয়া যায়।
সুরাইয়া আরো বলেন, পুরো কুরআন মাজিদ স্বহস্তে লিখতে উৎসাহ প্রদান করেছে আমার চোট ভাই নাহিদ হাসান। সে আবেদনগর দাখিল মাদ্রাসার ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আমার চোট ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতে হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ সহিহ বুখারিও স্বহস্তে লেখার ইচ্ছে পোষণ করে দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন সুরাইয়া জান্নাত।
সুরাইয়া জান্নাতের মা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ছোটবেলা থেকেই সুরাইয়া জান্নাত আরবি ভাষা থেকে আরবি লেখায় প্রিয় হয়ে ওঠে। দীর্ঘ ৮ মাসের সাধনায় নিজ হাতে ৩০ পারা পবিত্র কুরআন মাজিদ লিখে অনন্য ইতিহাস গড়লেন। মেয়ের অনুভূতি প্রকাশ পেয়ে সুরাইয়া জান্নাতকে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেয় তার বাবা। গরিব দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায় সুরাইয়া, আসতে চায় সবার উপকারে।
লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা বলেন, বয়সের সেই উত্তাল সময়ে ৩০ পারা পবিত্র কুরআন মাজিদ স্বহস্তে লিখে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন সুরাইয়া জান্নাত। লেখাটাও হয়েছে একেবারে ছাপা অক্ষরের মতো। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।