
নিজস্ব প্রতিনিধি\ কুমিল্লার লালমাই উপজেলার দরবেশপাড়া বাজার এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না হওয়ায় ডাকাতিয়া নদীর শাখা খালের পুনঃখনন কর্মসূচি থমকে গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল ৩৩ ফুট প্রশস্ত করে পুনঃখননের কথা থাকলেও বাজার অংশে অবৈধ দখলের কারণে মাত্র ৬ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। এতে বর্ষা মৌসুমে এই অঞ্চলের ৩ ফসলি জমি জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের দেশব্যাপী নদী-নালা ও খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় লালমাই ও লাকসাম উপজেলার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদীর শাখা দোশারীচোঁ খালের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪৫ দশমিক ৫৩ লাখ টাকা। ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি পুনঃখননের কাজ চলমান।
গত ১৬ই মার্চ কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ এয়াছিন কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াকে সঙ্গে নিয়ে প্রকল্পটি উদ্বোধন করেন। ইতোমধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ৭০ কিলোমিটার খনন কাজ শেষ হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ৪২টি গ্রামের প্রায় ২ হাজার হেক্টর কৃষিজমি জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে এবং ৭ হাজার ২শ’টির বেশি কৃষক পরিবার সরাসরি ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। পাশাপাশি আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টির ক্ষতি কমে কৃষিজমি পুনরায় ৩ ফসলি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে দরবেশপাড়া বাজার এলাকায় খালের প্রায় ২০০ মিটার অংশে ৩৩টি অবৈধ দোকান ও স্থাপনা থাকায় সেখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী খনন করা সম্ভব হয়নি।
বিএডিসির পক্ষ থেকে একাধিকবার নোটিশ প্রদান ও মাইকিং করার পরও দখলদাররা স্থাপনা সরিয়ে নেয়নি। এ অবস্থায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের জন্য গত ৭ই জুন কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেয় বিএডিসি। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ না হওয়ায় বাজার অংশে মাত্র ৬ থেকে ৮ ফুট প্রশস্ত করে খনন কাজ চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজারের বাইরে খালের দু’পাড়ের অনেক বসতঘর ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও বাজারের অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও খালের নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পেরুল দক্ষিণ ইউনিয়নের বাসিন্দা ওসমান গণি রিংকু বলেন, ভৈরবপুর, শাসনপাড়া, যশপুর, দোশারীচোঁ ও ফাজিলপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি, বাগান ও বসতঘর অপসারণ করে খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। তাই দরবেশপাড়া বাজারের অবৈধ স্থাপনাও একই নিয়মে উচ্ছেদ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত। কৃষকদের স্বার্থে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বিএডিসির কুমিল্লা অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী রুবায়েত ফয়সাল আল-মাসুম বলেন, দরবেশপাড়া বাজার এলাকায় প্রায় ২০০ মিটার অংশে অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ চেয়ে গত ৭ই জুন জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান শেষ হলে ওই অংশে পরিকল্পনা অনুযায়ী খাল পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন করা হবে।
লালমাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুব্রত বিশ্বাস দাস বলেন, আমি সম্প্রতি এ উপজেলায় যোগদান করেছি। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে, উপজেলার পেরুল দক্ষিণ ইউনিয়নের দরবেশপাড়া বাজারে খালের জমি পুনরুদ্ধার না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খালের উত্তর ও পূর্ব পাড়ের বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, দরবেশপাড়া বাজারের উত্তর পাশে একাধিক বাড়িঘর উচ্ছেদ করে খাল খনন করলেও বাজারে এসে খালের উপর দাঁড়িয়ে থাকা ৩৩টি অবৈধ দোকান উচ্ছেদ না করে খাল খননের নামে শুধুমাত্র ময়লা পরিষ্কার করা হয়েছে। এখন দরবেশপাড়া বাজার অংশে খালটি দ্রæত দখলমুক্ত করে কার্যকর খননের দাবি এলাকাবাসীর।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দরবেশপাড়া বাজারে খালের উপর ৩৩টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করেই দায়সারাভাবে খনন কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। খালের প্রস্থ বা চওড়া কমপক্ষে ৩০ ফুট হওয়ার কথা থাকলেও বাজার অংশে এসে কোথাও ১০ ফুট, কোথাও ১৫ ফুট কাটা হয়েছে।
পেরুল দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওসমান গণি রিংকু বলেন, খালের বেশিরভাগ অংশেই বাড়িঘর ছিল। সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনায় সকল অবৈধ বাড়িঘর উচ্ছেদ করে যথাযথ মাপ নিয়ে বাজারের উত্তর অংশের খাল খনন করলেও বাজার অংশে এসে অবৈধ দোকানগুলো উচ্ছেদ না হওয়ায় উত্তর অংশের বাড়িঘর হারানো ভুক্তভোগীদের নিকট আমরা জবাব দিতে পারি না। আমরা চাই আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হোক। এতে কারো কোনো অভিযোগ থাকবে না।
এ বিষয়ে লালমাই প্রেস ক্লাবের সভাপতি ড. শাহজাহান মজুমদার বলেন, সরকারের আগামী ৫ বছরে সারা দেশে ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুন:খননের অংশ হিসেবে পেরুল দক্ষিণ ইউনিয়নে প্রায় ৫ কিলোমিটার খাল খননের কার্যক্রম শুরু হয়। এতে খালের পাশের ৪২টি গ্রামের প্রায় ২৫০০ কৃষি পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে এবং জলাবদ্ধতা থেকে পরিত্রাণ পাবে ২ হাজার হেক্টর কৃষি জমি। কিন্তু মার্কেট বা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করে খাল খনন করলে খালের প্রকৃত নাব্য ও পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। যা সরকারি অর্থের অপচয় বাড়ায় এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি করে। তাই এখানে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া জানান, দেশব্যাপী চলমান নদী ও খাল খনন কর্মসূচির পাশাপাশি অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। লালমাইয়ে খাল খনন কার্যক্রম শুরুর দিনই বলে এসেছি, যারা খাল দখল করেছে তাদের দখলদায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে। সুতরাং সরকারি জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা রাখার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবে।