বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন

              ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ\ প্রতি বছর ১০ই সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং জীবন রক্ষায় পরিবার ও সমাজের দায়িত্বকে আরো শক্তিশালী করা। একজন মানুষ যখন তীব্র হতাশা, একাকিত্ব, অপমান, ব্যর্থতা, সম্পর্কের সংকট কিংবা নানা মানসিক চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন তার প্রয়োজন নিন্দা নয়: সহমর্মিতা, নিরাপদ পরিবেশ, চিকিৎসা ও মানসিক-আধ্যাত্মিক সহায়তা। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। জীবন মানুষের নিজের সৃষ্টি নয়; এটি মহান আল্লাহর দেয়া আমানত। তাই বিপদ, দুঃখ কিংবা হতাশার মুহূর্তেও নিজের জীবন নষ্ট করার পথ বেছে নেয়া ইসলামে বৈধ নয়। একই সঙ্গে ইসলাম মানুষকে হতাশার অন্ধকারে ফেলে রাখেনি; বরং আল্লাহর রহমত, ধৈর্য, দোয়া, নামাজ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আশাবাদী জীবনের দিকে আহŸান জানিয়েছে।

              জীবন আল্লাহর আমানতঃ মানুষের জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন: আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। (সূরা আন-নিসা:২৯)। এই আয়াত মানুষের জীবনের মর্যাদা এবং আত্মবিনাশের নিষেধাজ্ঞা স্পষ্ট করে। একজন মানুষ যত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই থাকুক, নিজের জীবন শেষ করে দেয়া সমস্যার ইসলামী সমাধান নয়। আবার কোরআনে বলা হয়েছে: আর নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না। (সূরা আল-বাকারা : ১৯৫)। এ নির্দেশনা শুধু আত্মবিনাশ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয় না; বরং নিজের নিরাপত্তা ও কল্যাণের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।

              হতাশা নয়; আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসাঃ জীবনে দুঃখ-কষ্ট আসবেই। কিন্তু কোনো সংকটই চিরস্থায়ী নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন: নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। (সূরা আশ-শরহ:৫-৬)। এই আয়াত বিপদের সময় মানুষের মনে আশার আলো জ্বালায়। আজকের কষ্ট ভবিষ্যতের সব পথ বন্ধ করে দেয় না। পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে, সহায়তা পাওয়া যেতে পারে এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করা সম্ভব। আল্লাহ আরো বলেন: আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না। (সূরা আয-যুমার:৫৩)। অতএব, হতাশার মুহূর্তে একজন মুসলিমের উচিত নিজেকে একা মনে না করা। আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া, দোয়া করা, নামাজে মনোযোগ দেয়া এবং বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে নিজের কষ্টের কথা বলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

              বিপদে ধৈর্য ইসলামের শিক্ষাঃ কোরআনে আল্লাহ বলেন: আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুৃধা এবং জানমাল ও ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। (সূরা আল-বাকারা:১৫৫) পরীক্ষা মানুষের জীবনের অংশ। এর অর্থ এই নয় যে কষ্টকে উপেক্ষা করতে হবে। বরং বিপদের সময় ধৈর্যের সঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে হবে, মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে পেশাদার সহায়তা নিতে হবে এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে।

              রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: মুমিনের ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক! তার সব বিষয়ই কল্যাণকর… (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)। হাদিসটির শিক্ষা হলো: মুমিন সুখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করে। তাই সংকটের মধ্যেও আ­ল্লাহর ওপর আস্থা ও ইতিবাচকতার পথ খোলা থাকে।

              আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়ঃ ইসলাম আত্মহত্যাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মহত্যার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি: ৫৭৭৮ এবং সহিহ মুসলিম: ১০৯)। এ আত্মহত্যা সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: আত্মহত্যার চিন্তা বা তীব্র হতাশায় আক্রান্ত কোনো মানুষকে শুধু ধর্মীয় ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়া উচিত নয়। বরং তাকে নিরাপদ রাখা, ভালোভাবে শোনা, পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্যকে জানানো এবং প্রয়োজন হলে দ্রæত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেয়া জরুরি। কারণ মানসিক সংকটও মানুষের অন্যান্য অসুস্থতার মতো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

              নামাজ হতে পারে আত্মিক শক্তির উৎসঃ মানুষ যখন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে, তখন ইবাদত তার হৃদয়ে স্থিরতা আনতে সহায়ক হতে পারে। আল্লাহ বলেন: জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়। (সূরা আর-রাদ:২৮) নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও জিকির মানুষের আত্মিক শক্তি বাড়াতে পারে। তবে গুরুতর মানসিক সংকটে শুধু ইবাদতের পরামর্শ দিয়ে চিকিৎসা বা প্রয়োজনীয় সহায়তা বাদ দেয়া ঠিক নয়। ইসলাম চিকিৎসা গ্রহণকেও উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহ এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি যার চিকিৎসা তিনি অবতীর্ণ করেননি। (সহিহ বুখারি: ৫৬৭৮)। সুতরাং মানসিক কষ্টকে ‘দুর্বল ঈমান’ বলে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

              পরিবারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশিঃ মানসিক সংকটে থাকা মানুষ অনেক সময় নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারেন না। তার আচরণে পরিবর্তন, অতিরিক্ত চুপচাপ থাকা, স্বাভাবিক কাজকর্ম থেকে দূরে সরে যাওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশার কথা বলা কিংবা নিজেকে বোঝা মনে করার মতো বিষয় দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

              পরিবারের করণীয় হলো: ১. বিচার না করে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। ২. তাকে একা না রাখা, বিশেষ করে যখন সে খুব ভেঙে পড়েছে। ৩. বিশ্বস্ত অভিভাবক, শিক্ষক বা নিকটজনকে বিষয়টি জানানো।

৪. প্রয়োজন হলে দ্রæত চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেয়া। ৫. ধর্মীয়ভাবে দোয়া, নামাজ ও আল্লাহর রহমতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া। ৬. তাকে অপমান, তিরস্কার বা ‘তুমি দুর্বল’ ধরনের মন্তব্য না করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। (সহিহ বুখারি: ৬০১৮; সহিহ মুসলিম: ৪৭)

              এই শিক্ষা বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের কথাবার্তা, আচরণ ও সহমর্মিতা অন্য মানুষের মানসিক অবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। ইসলাম আমাদের শেখায়, জীবন আল্লাহর আমানত। তাই হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ নয়; বরং আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা, ধৈর্য, দোয়া, পারিবারিক ভালোবাসা, সামাজিক সহমর্মিতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করতে হবে। নিজে আশাবাদী হই, অন্যকেও আশার আলো দেখাই: কারণ একটি জীবন রক্ষা করা মানবতার বড় দায়িত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *