👁 109 Views

লাকসামবার্তা’র তিন দশকের আলোকযাত্রা

\ ড. মো. মনিরুজ্জামান \

            আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে, যখন লাকসামবার্তা যাত্রা শুরু করে, তখন অত্রাঞ্চলের সংবাদপ্রবাহ ছিল সীমিত। কেন্দ্রীয় গণমাধ্যমে স্থান পেত না অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সমস্যা, সম্ভাবনা কিংবা মানুষের কথা। ঠিক সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই জন্ম নিয়েছিল লাকসামবার্তা।

            ২০২৬ সালের ৭ই জানুয়ারি, বুধবার- একটি স্মরণীয় দিন। এই দিনে লাকসামবার্তা পত্রিকা তিন দশকে (৩০ বছর) পদার্পণ করতে যাচ্ছে। দীর্ঘ ২৯ বছরের নিরবচ্ছিন্ন পথচলায় পত্রিকাটি কেবল একটি সংবাদমাধ্যম হিসেবেই নয়; বরং অত্রাঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক বিশ্বস্ত দলিল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই গৌরবময় উপলক্ষ্যে পত্রিকার অতীত ভূমিকার মূল্যায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে কিছু গঠনমূলক পরামর্শ উপস্থাপন করাই এই ফিচারের মূল উদ্দেশ্য।

            একটি পত্রিকার জন্ম মানেই কেবল কাগজে ছাপা কিছু খবর নয়; বরং তা একটি সমাজের আশা-আকাঙ্খা, সমস্যা-সম্ভাবনা ও স্বপ্নের প্রতিফলন। লাকসামবার্তা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই অত্রাঞ্চলের সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থান- প্রতিটি ক্ষেত্রে পত্রিকাটি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নজির স্থাপন করেছে।

            বিশেষ করে গ্রামীণ উন্নয়ন, অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সমস্যা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহে সাহসী প্রতিবেদন লাকসামবার্তা-কে পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন একাধিকবার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে- যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

            অত্রাঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় লাকসামবার্তা একটি শক্তিশালী মঞ্চ তৈরি করেছে। স্থানীয় কবি-লেখক, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সৃজনশীল লেখা প্রকাশের মাধ্যমে পত্রিকাটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর গড়ে তুলেছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় দিবস ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নিয়ে ধারাবাহিক ফিচার নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস-সচেতন করে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।

            লাকসাম-মনোহরগঞ্জ ও আশপাশের অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ- এ সব বিষয়ে পত্রিকাটি ধারাবাহিকভাবে জনমত গঠন করেছে। উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ুু পরিবর্তনের প্রভাব এবং নগরায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে লাকসামবার্তা প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে।

            লাকসামবার্তা-র সবচেয়ে বড় পরিচয়- এটি সাধারণ মানুষের পত্রিকা। কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, নারী, শিক্ষার্থী- সবাই এই পত্রিকায় নিজের কথা খুঁজে পেয়েছে। প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনা, অবহেলা ও ন্যায়সংগত দাবি তুলে ধরতে পত্রিকাটি ছিল সদা সোচ্চার।

            তিন দশকে পদার্পণের এই মাহেন্দ্রণে দাঁড়িয়ে লাকসামবার্তা-র সামনে নতুন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই বিদ্যমান। ডিজিটাল যুগে পাঠকের চাহিদা দ্রæত পরিবর্তিত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে বিশেষভাবে বিবেচনাযোগ্য-

১. ডিজিটাল সম্প্রসারণ: সময় বদলেছে, বদলেছে সংবাদ পাঠের ধরণ। ডিজিটাল যুগে তথ্যের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে দায়িত্বও। এই বাস্তবতায় লাকসামবার্তা-র সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

            অনলাইন সংস্করণকে আরও গতিশীল করা, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট সংযোজন, তরুণ পাঠকের রুচি ও আগ্রহকে গুরুত্ব দেয়া- এসব এখন সময়ের দাবি। তবে এই পরিবর্তনের মাঝেও যে বিষয়টি অপরিবর্তনীয় থাকতে হবে, তা হলো- সত্যনিষ্ঠা ও নৈতিক সাংবাদিকতা।

২. তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা: তরুণ লেখক ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাতা বা কলাম চালু করা।

৩. অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জোরদার করা: স্থানীয় সমস্যা, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আরও গভীর অনুসন্ধান।

৪. উন্নয়নমূলক পরামর্শভিত্তিক লেখা: কেবল সমস্যা নয়, সমাধানমুখী ফিচার ও বিশ্লেষণ প্রকাশ।

৫. নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর: তাদের সমস্যা ও সাফল্যকে আরও বেশি গুরুত্ব দেয়া।

            তিন দশকের পথচলা সহজ নয়। লাকসামবার্তা সেই কঠিন পথ অতিক্রম করে আজ একটি পরিপক্ব, দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব পত্রিকায় রূপ নিয়েছে। অতীতের সাফল্যকে পাথেয় করে, বর্তমানের বাস্তবতাকে বুঝে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে ধারণ করে- পত্রিকাটি আরও বহু দশক অত্রাঞ্চলের উন্নয়ন ও সত্যের পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠস্বর হয়ে থাকবে- এমন প্রত্যাশাই রইল।

            তিন দশকের এই আলোকযাত্রায় লাকসামবার্তা-কে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা। লেখকঃ সহযোগী অধ্যাপক, আরবী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *